default-image

১৯৮৯ সালে স্বপ্নের দেশ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের রাজধানী লসঅ্যাঞ্জেলেসে আমার প্রথম পদার্পণ, আর সেখান থেকেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পদচারণা। আমার কর্ম আর বাসস্থান ছিল একই ছাদের নিচে, আর সেটা ছিল পৃথিবী বিখ্যাত চিত্রজগত হলিউডের নিকটবর্তী এলাকা মেলরোজে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। এই সুবাদে ছুটির দিনে পুরো হলিউড এলাকা চষে বেড়াতাম। হলিউডের কয়েকটা রাস্তায় দেখতাম বিচিত্র আলপনা আঁকা ঝকঝকা তকতকা। কোথাওবা প্রয়াত হলিউড তারকাদের হাত পায়ের ছাপ। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মোজাইক করা করিডোরে নয়ন জুড়ানো স্থাপনায় এঁটে দেওয়া হয়েছে। হাজারো দর্শনার্থী ভিড় জমায়। কেউ বা তারকাদের হাতের ছাপে হাত রেখে ছবি ওঠায়। আমি দেখে দেখে হাসতাম আর সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় বলতাম, ‘যে প্রদীপ অন্য প্রদীপ হইতে একবার অগ্নিশিখা আরোহণ করিয়া প্রদীপ্ত হইয়া নিভিয়া গিয়াছে সেই প্রদীপ কি পৃথিবীর সব প্রদীপকে প্রজ্জ্বলিত করিতে পারিবে?’ অবশ্যই তার জন্য সাধনার দরকার। একজন প্রয়াত তারকার হাতের ছাপে অন্যের হাত মিলিয়ে ছবি ওঠালেই কোনো নামীদামি তারকা হওয়া যায় না। কিছু দূর এগোলেই দেখতাম ইউনিভার্সেল স্টুডিও, এক অনন্য স্থাপনা, তার জৌলুশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যি বলতে কি তখন আমার এই সব স্টুডিও চেনার বা জানার কোনো আগ্রহ ছিল না। দেশে থাকতে সিনেমা হলে কিছু ইংরেজি ছবি দেখার সমাপ্তিতে দেখতাম বড় পর্দায় ভেসে উঠেছে ‘ইউনিভার্সেল স্টুডিও’ নামটি। সেই থেকে এ নামটি স্মৃতির পর্দায়ও গাঁথা ছিল।
মেলরোজে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ছিল। আমার খাবার পরিবেশক হিসেবে প্রথম হাতেখড়ি সেখানেই। একদিন এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম রেস্টুরেন্টে নাকি মাঝেমধ্যে হলিউডের তারকারা খেতে আসেন। আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকতাম একনজর দেখার ইচ্ছে নিয়ে। একদিন সত্যিই একজন এল। কিন্তু সে একজন খুদে তারকা বার–তেরো বছর বয়সী এক কিশোর। তাকে দেখেই অনেক চেনা জানা মনে হলো। প্রায় সময় তাকে টিভি সিরিয়ালে দেখা যেত। তাকে দেখে বুঝলাম আমাদের দেশের শিল্পীদের মতো ওরা এত ঘটা করে সাজগোজ করে না। তাই প্রথম সাক্ষাতেই তাদের চেনা যায়। তারপর এক প্রকার অযাচিত হয়েই ওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এই বয়েসের এক কিশোর শিল্পীর বিচক্ষণতা দেখে মনে হলো তাকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা আমি হারিয়ে ফেলেছি।
এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। জীবনে এসেছে অনেক চড়াই-উতরাই, ঘাত-প্রতিঘাত। সেদিন আমার মেয়ে রোমানা জানাল আমরা ফ্লোরিডাতে বেড়াতে যাচ্ছি। আমার বড় মেয়ে তাহমিনার বাসায় থেকে ফ্লোরিডার বিখ্যাত স্থানগুলো ঘুরে দেখব। এর মধ্যে অরলেন্ডুতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল স্টুডিও দেখার পুরো প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের সবার জন্য বিমানের টিকিট সংগ্রহ করা হয়েছে। আমি আর দ্বিমত পোষণ না করে মনে মনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। এর আগেও ফ্লোরিডার অনেক স্থান ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এবার বাড়তি একটা আকর্ষণ হলো ইউনিভার্সেল স্টুডিও দেখা। ফ্লোরিডার ফটমায়ার্স থেকে সকাল নয়টায় আমরা যাত্রা শুরু করে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে অরলেন্ডুর ইউনিভার্সেল স্টুডিওতে পৌঁছলাম। প্রথমে তো কিছু হতাশ হয়ে গেলাম। কারণ অরলেন্ডুর ম্যাজিক্ কিংডম যে শানশওকতে ভরপুর ইউনিভার্সেল স্টুডিওতে এতটা চোখে পড়েনি। তারপরেও ঘুরে দেখলাম পারিপার্শ্বিকতা। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য তৈরি কার্টুন মুভিগুলো আমার নাতি–নাতনিদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছে। 3D চোখে পরে ওরা প্রচুর উপভোগ করেছে।
ট্রান্সফরমার, স্পাইডারম্যান, মিনিয়ন, হেরি পটারের মতো বিখ্যাত শিশুতোষ ছবিগুলো খুবই উপভোগ্য ছিল। কিছু দূর এগিয়ে দেখি ঝোলানো এক বিরাট সাইন। তাতে লেখা আছে “Garden of Allah Villas”। প্রথমে একটু হোঁচট খেলেও পরে বুঝলাম এটা একটা মোটেলের নাম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0