উত্তম বা সার্থক ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাহিত্য। সমৃদ্ধ সাহিত্য না থাকলে সে ভাষা কোনোভাবেই কুলীন হয় না। বাংলা ভাষার সাহিত্য গৌরব জগদ্বিদিত। হাজার বছরের প্রাচীন এই সাহিত্য নন্দিত বিশ্বসাহিত্যের পরিমণ্ডলে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) নোবেল পুরস্কার জয়ের মধ্য দিয়ে এ ভাষার গৌরবগাথাকে অবিস্মরণীয় করে তুলেছেন। তিনি বাংলা ভাষার প্রধান বর্ণমালা বাংলালিপিতেই রচনা করেছেন তাঁর সৃষ্টিসম্ভার। বাংলা সাহিত্যের প্রায় ষোলো আনা রচনাই বাংলালিপিতে। তবে এর ব্যতিক্রম হয়েছে চতুর্দশ শতকে বাংলা ভাষার অন্য বর্ণমালা ‘সিলেটী নাগরীলিপি’ চালু হওয়ার পর। নাগরীলিপিকে অনেকেই বাংলা বর্ণমালার বিকল্প লিপি বা বর্ণমালা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ষোড়শ থেকে বিংশ শতাব্দী—এই দীর্ঘ সময়ে যুগপৎভাবে বাংলা সাহিত্য চর্চা হয়েছে বাংলালিপি এবং সিলেটী নাগরীলিপিতে। লিপির ভিন্নতা থাকলেও ব্যবহৃত হয়েছে এক অভিন্ন ভাষা। তবে সিলেটী নাগরীলিপি সাহিত্যে সিলেট অঞ্চল প্রভাবিত বাংলার ব্যবহার হয়েছে একচ্ছত্রভাবেই। মোটা দাগে সিলেটের উপভাষাই ব্যবহার হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে দুটো লিপিতেই বাংলাভাষী মানুষের হাতে রচিত হয়েছে সাহিত্য বা জীবনের পাঠ। সিলেটী নাগরী প্রবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। গবেষক এস এম গোলাম কাদিরের মতে, ‘সময়ের তাগিদে সমাজমানসের প্রয়োজনে একটি বিশেষ এলাকার জনগোষ্ঠী তাঁদের জীবনাচার ও মানসোল্লাসের প্রকাশ ঘটিয়েছে একটি বিশিষ্ট লিপিমালার মাধ্যমে, অঞ্চল প্রভাবিত বাংলা ভাষায়। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে এবং সেটি হচ্ছে নতুন এক লিপিমালার আবিষ্কার এবং দীর্ঘ তিন শতকব্যাপী জীবনে ও সৃষ্টিকর্মে তাঁর লালন। যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য এটি যুগান্তকারী গৌরবের সুকৃতি ও সৃজনী প্রতিভার স্বাক্ষর। এদিক থেকে সিলেটী নাগরী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অনন্য ও বিস্ময়কর অধ্যায়।’১
এ কথা সত্য, নাগরীলিপি সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোতোধারায় প্রবাহিত হতে পারেনি। এই সাহিত্য শুধু লিপি ভিন্নতার কারণে যুগের পর যুগ, শতকের পর শতক বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো চরম হেলায় থেকেছে। তারপরও নাগরীলিপিতে রচিত বাংলা সাহিত্যের পরিসর বিস্তৃত। দৈনন্দিন জীবনে এই লিপি চর্চার পাশাপাশি রচিত হয়েছে প্রায় দু শ গ্রন্থ। ধর্মীয় গ্রন্থ, সুফি শাস্ত্র, সুফি তত্ত্বাশ্রয়ী মানবিক প্রণয় উপাখ্যান, সামাজিক উপাখ্যান, যুদ্ধ কাহিনি ইত্যাদি বিষয়ের গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং পাঠকের কাছে আদৃত হয়েছে।
এ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য ও সংগৃহীত সূত্র থেকে অর্ধশতাধিক নাগরী পুথি রচয়িতার ভনিতাসংবলিত কবিতাংশ এবং গান পাওয়া গেছে। তবে অল্পসংখ্যক কবি ও সাহিত্যিকের পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বহু কবি-সাহিত্যিকের জীবনকাল এখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। তাঁদের পূর্ণাঙ্গ রচনাবলির সঙ্গে পাঠক-গবেষকদের পরিচয় এখনো ঘটেনি। আদৌ হবে, এমন লক্ষণ চোখে পড়ে না।
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের (১৯০৫-১৯৯০) সংগ্রহে সিলেটী নাগরীলিপিতে লেখা ৩০টি পুথি ছিল। সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে সিলেটী নাগরীলিপিতে হাতে লিখিত ৪-৫টি পুথি সংগৃহীত আছে। গোলাম হোসেন রচিত তালিব হুসন, সৈয়দ শাহ হুসন আলম রচিত ভেদসার ও সৈয়দ শাহনূর রচিত নুর নছিহত পুথির পাণ্ডুলিপি মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর সংগ্রহে ছিল। চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ হাতে লেখা ২৪ পাণ্ডুলিপির সন্ধান দিয়েছেন। মোহাম্মদ সাদিকের সংগ্রহে রয়েছে কিছু পুথি। এ ছাড়া আমিনুর রশীদ চৌধুরী কয়েকটি পুথি সংগ্রহ করেছিলেন।
সিলেটী নাগরীলিপি অবলম্বনে সাহিত্যসাধনা করেছেন কত লেখক ও কবি—তার সংখ্যা নিরূপণ সহজসাধ্য নয়। বরং বলা যেতে পারে, প্রায় অসাধ্য কাজ। সিলেট অঞ্চল ও তার চারপাশ ঘিরে সাহিত্য চর্চার প্রচলন ছিল কয়েক শ বছর। কত মানুষ তাঁদের লেখায় নাগরীলিপি ব্যবহার করেছিলেন, তার হিসাব তখন তো নয়ই, একালেও কেউ রাখে না। সাধারণত, এ লিপিতে যাঁরা সাহিত্যসাধনা করেছেন, তাঁরা ছিলেন ফকির-দরবেশ। এঁদের সবার রচনাশৈলীর মান ও ধরন মোটেও এক নয়। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ালেই এঁদের রচনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে।
এ পর্যন্ত সিলেটী নাগরীলিপিতে যে সাহিত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবই পদ্য আকারে লেখা, গীতিকাব্য এবং কাহিনিকাব্য যা পুথি নামেই পরিচিত। দলিল-দস্তাবেজ এবং ব্যক্তিগত চিঠি ছাড়া গদ্যের নিদর্শন পাওয়া যায়নি বললেই চলে।
যদিও নাগরীলিপিতে সব রচনাই পয়ার বা পদ্যে, তারপরও সংক্ষিপ্ত পরিসরে গদ্য রচনার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। তবে সেই চেষ্টা দেখি নাগরীলিপির অবলুপ্তির কালে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। সিলেট থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রাচীন সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরী সিলেটী নাগরীলিপিতে গদ্যসাহিত্য রচনা করেছেন। তবে সেটি ছিল নাগরীলিপির রীতি অনুকরণে বাংলালিপিতে। এ লিপি বা বর্ণমালায় নাগরীলিপিতে যে অনায়াসে ও সাবলীলভাবে গদ্য লেখা সম্ভব তা-ই তিনি প্রমাণ করেছেন। তাঁর রচনার নমুনা, ‘খিরিষ্টীয় চর্তুদশ শতাব্দীর পরথর্মাধে হজরত শাহজলাল মর্র্জদ ইএমনী শিলেটে উপস্থিত হন। তিনি আরব দেশের ইএমন পরদেশে জনম র্গহন করিআছিলেন বলিআ পরসীদ্ধী আছে। ইরাক পারইস্ আফগানিস্তান দিল্লী এলাহাবাদ র্পভিরিতি স্থান অতির্কম করিআ তিনি শিলেট আগমন করেন। শিলেটে ইহার র্পুবেও কিছু সহংখক মুসলমান বিদদমান ছিলেন। তাহার শিলেট জয় ও এখানকার পারবইত্ত জাতিয় হিন্দু রাজার পরাজয় তাহার অলউকিক্ শক্তি ও র্ধম পরচারের ফলে শিলেটের বহু পরিবার ইশলাম ধরম র্গহন করেন।’
এককালে সিলেটে আরবি, ফারসির প্রচলন ছিল। কিন্তু তা সর্বজনবোধ্য ছিল না। সাধারণ মানুষের কাছে আদৃত ছিল নাগরীলিপি। সিলেটী নাগরীলিপিতে লিখিত নুর নছিহত গ্রন্থটি খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই সম্পর্কে শাহনূরের বক্তব্য ‘আরবি ফারসি কেও বুঝিতে না পারে।/নাগরী করে লিখে দিল সবে পাইবারে।’
সিলেটী নাগরীতে রচিত সাহিত্যের মূল প্রেরণা বা উজ্জীবনী এসেছে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নাগরীলিপির প্রবর্তকেরা এবং যাঁরা এর চর্চা করেছেন তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান এবং সুফিবাদী। ফলে, নাগরীতে রচিত সাহিত্যসম্ভারের কিছু গ্রন্থ, যেমন প্রণয়োপাখ্যান, সামাজিক চিত্র, কোনো কোনো যুদ্ধ কাহিনি এবং দু-চারটি জীবনীগ্রন্থ ব্যতীত বাকি সব গ্রন্থই ধর্মীয় অনুরাগ থেকে অনুপ্রাণিত।
আটপৌরে জীবনের মতোই স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাবলীল সিলেটী নাগরী সাহিত্য। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এর ভিত্তিমূল প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ লিপিকে ব্যবহার করে রচিত হয়েছে প্রাকৃত জীবনের ইতিবৃত্ত। মানুষের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড, প্রাত্যহিক জীবনের বিধি-নিষেধ, প্রবহমান বাস্তবধর্মী সুখ-দুঃখের কথা, এমনকি ধর্মীয় অনুশাসনের নিত্যচর্চার প্রয়াস, মারফতি তত্ত্বের সহজ ব্যাখ্যা, ভাব-আবেগ আর ভক্তিমূলক জীবনের উপস্থাপনায় এই ভাষা নিরক্ষর পল্লি মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। সে কারণেই গ্রামবাসী রাতের পর রাত জেগে আজও শোনেন তাঁদের প্রিয় আল্লাহ-রাসুলের কথা, ধর্ম আর প্রিয় পীর দরবেশের কাহিনি কথা। পল্লিবাসীর প্রেমময় জীবনে যেখানে হৃদয়ের ছোঁয়া প্রবলভাবে আলপনা এঁকে যায়, সেখানে সিলেটী নাগরী সাহিত্য হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে আসন নেওয়ার মতো রসদ আর উপকরণ সরবরাহ করেছে প্রবলভাবে। যুগ-যুগান্তরের ভাষার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ‘সিলেটী ফুল নাগরী’ তাই এক অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছে।
লোক সাহিত্যিক মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন লিখেছেন, ‘নাগরী হরফে ছাপাকৃত পুস্তকাদির বিষয়বস্তু বিচিত্র্য। কতকগুলোতে মুসলমানদের নিত্য অনুষ্ঠেয় ক্রিয়াকলাপ, বিধি-নিষেধ, কতকগুলো মারফত বা আধ্যাত্মিক বিষয়, আবার কতকগুলোতে মহাপুরুষদের জীবনী বিধৃত হয়েছে। আবার কতকগুলো পুস্তক গল্প ও উপন্যাস শ্রেণির। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাব্য রচনার প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থাবলি অল্পশিক্ষিত লোক তথা গোটা সমাজের সুখ-দুঃখের সান্ত্বনা এবং আমোদ ও বিনোদনে বিশেষ সহায়ক ছিল। ফল হিসেবে গ্রামাঞ্চলে আজও সিলেটী নাগরী ভাষা ও সাহিত্য অনেকেরই জানা। সিলেটের গ্রামাঞ্চলের এমনও লোক আছেন যাদের জাতীয় ঐতিহাসিক জ্ঞান আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাঁরা জ্ঞাতব্য বিষয় সম্পর্কে মোটেও অজ্ঞ নন। তাঁরা খোলাফায়ে রাশেদিন, বীরবর খালেদ-বিন-ওয়ালিদ, মহাবীর তারেককে চেনেন। তাঁরা কোনো বিজয়ের সন তারিখ বলতে না পারেন, মিশর হামলাকারীর নাম-ধাম না জানুন, কিন্তু ঘটনাবলি হুবহু বলে দিতে পারেন। এসব নাগরী পুথি সাহিত্য তাঁদের এ-জ্ঞানের খোরাক জুগিয়ে চলেছে আবহমান কাল ধরে।’
সিলেটী নাগরীলিপি সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত লেখক হচ্ছেনÑসৈয়দ শাহনূর, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, মমিনউদ্দিন দইখুরা, শেখ ভানু, দীন ভবানন্দ। এঁরা সবাই গীতিকবি। তাঁদের সবাই এই নাগরীলিপিতে মরমি গান রচনা করেছেন। গবেষক ফাতেমা চৌধুরীর মতে, ‘...সিলেটের মরমি সাধক কবিরা সিলেটী আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে পুঁজি করে জন্ম দেন সিলেটী নাগরীলিপি। এই লিপিতে চতুর্দশ শতক থেকে উনিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে অজস্র গান রচনা করে যান তাঁরা। সিলেটী বাংলা কবিতা, গানের বিপুল রসভান্ডার সিলেটী নাগরীলিপির ফসল। ...যুগ সভ্যতার এই সংকটলগ্নে আমাদেরই আত্মিক ও পার্থিব স্বার্থে সিলেটী নাগরীলিপির সাহিত্য পূর্ণাঙ্গরূপে পুনরুদ্ধার করা আজ অনস্বীকার্য...।’
গান রচনায় সিলেটী নাগরী রচয়িতাদের ভূমিকা অপরিসীম। শাস্ত্র ও মারিফতি তত্ত্বমূলক রচনা ও গানেও ব্যবহার করা হয়েছে এই লিপি। কেবল সংগীত গ্রন্থ হিসেবে উনিশ শতকের শিতালং শাহের রাগ শিতালং, রাগ বাউল, সৈয়দ শাহনূরের নুর নছিহত, আমানউল্লাহর রাগনামা, মমিনউদ্দিনের দইখুরার রাগ, বুরহান উল্লাহর রাগনামা, শাহ আরকুমের কবিনামা, হকিকতে সিতারা, শেখ ভানুর পুথি শেখ ভানু এবং বিশ শতকে রচিত আকবর আলীর এশকে দেওয়ানা, প্রেম পাগল, ইয়াছিনের আশিকে খোদা হুব্বে রাসুল, আবদুল মজিদের আশিকনামা, আবদুল ওয়াহেদের তয়াকুল্লিয়া প্রেম ভান্ডার। নসিম আলীর হরফুল খাসলত, মুনশি ইরফান আলীর রুহুল মারিফত, জহুর হোসেনের মারিফাতে জওয়াহের।
নাগরীলিপির সাহিত্যে প্রেম-প্রণয়ের কিছু উপাখ্যান রয়েছে এবং জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। আঠারো শতকে রচিত মুহম্মদ খলিলের চন্দ্রমুখী, উনিশ শতকে মুনশি সাদেক আলীর মহব্বতনামা, মুহম্মদ জওয়াদের বাহরাম জহুরা এবং বিংশ শতকে রচিত আবদুল লতিফের বসন্ত ভ্রমরা নামে চারটি প্রণয়োপাখ্যানমূলক কাহিনিকাব্যের খোঁজ পাওয়া যায়।
ফাতেমা চৌধুরী দীর্ঘদিন সিলেটী নাগরীলিপি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর সিলেটী নাগরীলিপি সমীক্ষা গ্রন্থে বলেন, ‘ধর্মীয় বিধান, সৎ সাহিত্য, মহৎ সাহিত্য, কেচ্ছা কাহিনি, ইতিহাস, জীবনী, গান, গজল, দলিলদস্তাবেজ, সামাজিক ইতিহাসের টুকরো খবর, রাষ্ট্রীয় বিবরণ ইত্যাদি সিলেটী নাগরীতে লেখা হয়েছে। সিলেটী নাগরী শুধু একটি স্ক্রিপ্ট বা ভাষা জপ নয়Ñএটি একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যানাসস্ক্রিপ্ট বটে। মরমিয়া কবিদের বিপুল সাহিত্য-কর্ম সিলেটী নাগরীতে রচিত হয়ে আজও পাঠকের মনোরঞ্জন করে চলেছে। মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেমন করে পুথি সাহিত্য বিকাশ ও সমৃদ্ধির এক উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছিল, তেমনি সিলেটী নাগরী ভাষায় রচিত ইসলামি সাহিত্য ও কাব্যও একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যের দাবিদার।’
জীবনীমূলক গ্রন্থ রচিত হয়েছে অনেক। সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় গ্রন্থ হালতুন্নবী জীবনমূলক কাহিনিকাব্য। এ পুস্তক মুদ্রণের মধ্য দিয়ে ১৮৭০ সালে নাগরী মুদ্রণের যুগে প্রবেশ করে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইসলামিয়া প্রেস এবং মুনশি আবদুল করিমের নাম। একে একে আরও ৫টি ছাপাখানা তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ শ্রেণির অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে, উনিশ শতকে রচিত মুনশি ইরফান আলীর শাহজালালের তয়ারিখ, বুরহানুল্লাহর হালতুন্নুর, বিশ শতকে রচিত আবদুর রহমানের শাহজালালের পুথি, শরাফতুল্লাহর আলী আমজাদ সাহেবের কবিতা, ফজলউদ্দিনের ওলিগণের কবিতা।
যুদ্ধ কাব্যও কম রচিত হয়নি নাগরীতে। জঙ্গনামা কাহিনি কাব্যের পাঠকপ্রিয়তা ছিল বিপুল। মহরম মাসে ঘরে-ঘরে, পাড়ায়-মহল্লায়, গ্রামে-গ্রামান্তরে জঙ্গনামা পাঠের মধ্যে ভক্ত নরনারী স্মরণ করতেন কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস। ওয়াহেদ আলীর জঙ্গনামা তাই ঘরে ঘরে সমাদৃত একটি পুথি। আবদুল করিম সোনাভানের পুথি রচনা করেছেন। এটিও যুদ্ধ কাব্য। সোনাভানের প্রেম এবং যুদ্ধের সমন্বয়ে এক লোকহৃদয়স্পর্শী আখ্যান।
নাগরীলিপির সর্বাধিক গ্রন্থ হচ্ছে ধর্মবিষয়ক, সংগীত (মারফতি, মুর্শিদা, বাউল) এবং সুফিতত্ত্ববিষয়ক পুথি। ষোড়শ শতকে রচিত গোলাম হোসেনের তালিব হুসন এবং শাহ সৈয়দ হুসন আলমের ভেদসার দুখানা বিশিষ্ট মারফতি সংগীত ও তত্ত্বগ্রন্থ। উনিশ শতকে রচিত মুনশি ইরফান আলীর মফিদুল মুমেনিন, আখবারুল ইমান, আমানউল্লাহর মফিদুল ইসলাম, ওয়াজেদ উল্লাহর হুসিয়ারে গাফেলীন, মাহে রমজান, আবদুল করিমের ওয়াজিবুল আলম, অজু নমাজের কবিতা, জহুর হোসেনের মারিফাতে জওয়াহের, আবদুল কাদিরের আককামে শরা ও নসিম আলীর দোয়া কলম এবং বিশ শতকে রচিত মুনশি জাফর আলীর অছিওতুন্নবী, মজহারুল ইসলামের তরিকুন্নবী, অজ্ঞাতনামা কবির সিরাজুল মসাইল, শফাতুন্নবী প্রভৃতি শাস্ত্রগ্রন্থ উল্লেখযোগ্য।
সৈয়দ শাহনূরের নুর নছিহত, মুনশি সাদেক আলীর পান্দেনামা, মৌলানা আবদুল ওয়াহাব চৌধুরীর ভেদকায়া, ফকির আমানের ভেদচরিত, হাজি মোহাম্মদ ইয়াছিনের রুহুল মারিফত, শিতালং ফকিরের মুশকিল তরান ও রাগ হকিকত, মমিনউদ্দিনের দৈখুরা রাগ, মুনশি ইরফান আলীর রাহাত নামা, আমান উল্লাহর রাগনামা, বুরহান উল্লা ওরফে চেরাগ আলীর হালতুন্নুর ও রাগনামা, শাহ হরমুজ আলীর দিল নছিহত ও হরমুজ নছিহত, আবদুছ ছমদের নছিহতনামা, শাহ আরকুমের হকিকতে সিতারা, আবদুল হাকিমের নছিহতনামা, ভেলা শাহের খবর নিশান, শেখ ভানুর পুথি শেখ ভানু, সৈয়দ জহুরুল হোসেনের নূর নাজাত ও মারফতে জয়াহির, আবদুল করিম ছোটদেশীর হুসিয়ার নামা, অধীন জফরের আসকনামা, হাতিমুর রহমানের আগাজ পুথি, আখের তরান, নছিম আলীর হরুফুল খাছলত প্রভৃতি প্রধান।
এ ছাড়া বিবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু গ্রন্থ রচনার প্রয়াস দেখা যায়। এগুলো জীবননিষ্ঠ ও সমাজসচেতন রচনার প্রয়াস। উনিশ শতকে রচিত সৈয়দ শাহনূরের সাত কন্যার বাখান, আছদ আলীর সহরচরিত, মুনশি আবদুল করিমের কড়িনামা, বিশ শতকে রচিত সাইদুর রহমানের দেশচরিত, অজ্ঞাতনামা কবির আহওয়ালে জামানা, পেচার গল্প ইত্যাদি।
লোকসাহিত্য গবেষক চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের সিলেটী নাগরী পরিক্রমা (১৯৭৮) একটি মূল্যবান গ্রন্থ। আমাদের জানা মতে, নাগরীলিপির পরিচয় ও সাহিত্য আলোচনায় এটিই প্রথম গ্রন্থ। সিলেট জেলা পরিষদের অর্থায়নে ‘জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ, আম্বরখানা, সিলেট’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থটি। এর আগে সিলেটী নাগরীলিপি নিয়ে মূল্যবান প্রবন্ধাবলি মুদ্রিত হলেও গ্রন্থ হিসেবে সিলেটী নাগরী পরিক্রমাই প্রথম গৌরবের অধিকারী। এ গ্রন্থের ৩৪ থেকে ৩৯ পৃষ্ঠায় তিনি ‘মুদ্রিত পুথি ও পাণ্ডুলিপি’ শিরোনামে ৫৬ জন লেখকের ৮৮টি ছাপা পুথি এবং ২৪টি পাণ্ডুলিপিসহ মোট ১১২টি গ্রন্থের তালিকা পেশ করেছেন। পরে আরও কিছু ছাপা পুথি এবং অমুদ্রিত পাণ্ডুলিপির নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সিলেটী নাগরীলিপিতে গ্রন্থ রচনার কাজ অব্যাহত ছিল। কোনো কোনো গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় পুথি কেতাব হালতুন্নবী, জঙ্গনামা, মহব্বতনামা, হরিণনামা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
লিখতে না জেনে কেবল চোখে দেখে দেখে মুসলমানরা কোরআন পাঠের কৌশল আয়ত্ত করতে পারেন। সিলেটী নাগরীর পাঠন-পাঠনের ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতিটাই অনুসৃত হয়েছে। ফলে হাতে-কলমে লিখতে না-জেনেও আড়াই দিনের চেষ্টার বদৌলতে অনেকেই সিলেটী নাগরী হরফে লেখা গ্রন্থাদি চোখে দেখে দেখে বেমালুম পড়ে যেতে পারেন। ফলে এই লিপিতে লেখকের চেয়ে পাঠকের সংখ্যা ছিল শত শত গুণ বেশি। বাংলাদেশের একটা বিরাট অঞ্চলের গণমানুষের পৃষ্ঠপোষকতায় সিলেটী নাগরীলিপি সাহিত্য চার-পাঁচ শ বছর টিকেছিল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0