default-image

নিউইয়র্ক নগরের মেয়রের টাউন হল সভা ছিল ২৪ মার্চ। কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্ট ২৪-এর আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট মেলিন্ডা কার্টজ, অ্যাসেম্বলি সদস্য মাইকেল ডেনকার্ক ও স্থানীয় কাউন্সিলর ড্যানিয়েল ড্রম। অনুষ্ঠানের জন্য ছাপানো প্রচারপত্রে ছিল বেশ কয়েকটি ভুল বানান। যেমন মার্চ এর জায়গায় লেখা ‘মারর্চ), বন্ধের জায়গায় লেখা বনধ ইত্যাদি। কোন কোন বাক্য এমন ভুল বানানে ছাপানো, যেখানে পুরো বাক্যটিই পড়া দায়। এই প্রচারপত্র দেখিয়ে ব্রুকলিনের একজন অভিবাসন অধিকার কর্মী এবং সাংবাদিক সোহেল মাহমুদ বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ওই অভিবাসন অধিকারকর্মী বলেন, ‘ল্যাংগুয়েজ একসেস কিংবা ল্যাংগুয়েজ জাস্টিস শব্দ গুচ্ছের সঙ্গে পরিচয় নেই যাদের, অথবা যারা ১০০ পাওনায় ৩০ পেলে খুশিতে গদগদ হয়ে যান, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন না—তাদের কাছে বাংলার এমন বিকৃত রূপে কিছুই যায় আসে না। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, “আরে ভাই, তারা এটুকু যে করেছে কত!” এর মানে, এমন বাংলা নিয়ে তারা সবাই তুষ্ট।’
সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘গত বছর নিউইয়র্ক নগরের একটি বাজেট ব্যালটে কী পরিমাণ ভুল ছিল, সে নমুনা আমার কাছে আছে। আর সে সময় এই ব্যালট আমি আবার ছাপাতে বাধ্য করেছিলাম তাদের। বিনা মূল্যে প্রায় দুই হাজার শব্দের সেই ব্যালট আবার অনুবাদ ছাপিয়েছি।’ তিনি বলেন, বিকৃতির অন্তত দুটো কারণ পাওয়া গেছে। গুগলকে অনুবাদক বানানো কিংবা অনুবাদকের গুগলের সাহায্য নেওয়া। দ্বিতীয়ত, বাংলা সফটওয়্যার পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার না করা বা না জানা। বাংলার এই বিকৃতি আজকের নতুন নয়। বাংলার ব্যবহার বাড়ায় এখন বেশি ভুল হচ্ছে। অথচ আমাদের বাংলাদেশ সমিতি বা সোসাইটি অথবা বাংলাদেশ কনস্যুলেট এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না।
ফেসবুকের সৌজন্যে সেই প্রচারপত্রটি এসেছে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার হাতে। মেয়র অফিসের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তুলে ধরতে যারা সময়ে সময়ে যোগাযোগ রক্ষা করেন, তাদের একজন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বিশ্বজিৎ সাহা। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা খুবই আনন্দিত যে বাংলাকে আমলে নিয়ে বাংলায় পোস্টার এমনকি ভোটের জন্য প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রচারপত্র করছে নিউইয়র্ক সিটি করপোরেশন। কিন্তু যখন দেখি সেখানে বাংলা ভাষার ভুল প্রচারণা হচ্ছে, সেটা আমাদের কষ্ট দেয়। এর আগে, একটি ডায়াসপোরা আলোচনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছিলাম। মেয়র অফিসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলাম। এবার লিখিতভাবে এ বিষয়ে আমরা মেয়র অফিসকে জানাব।’
মেয়র পদে নির্বাচনের আগে মেয়রপ্রার্থীর জন্য তহবিল সংগ্রহে কাজ করেছিল নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট ফকরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, ‘আমার চোখে স্পষ্টভাবে বানান ভুলের বিষয়টি হয়তো ধরা পড়েনি, তবে আমি আগেও এমন অভিযোগ শুনেছি। সঠিক প্রমাণ পেলে অবশ্যই আমরা বিষয়টি মেয়র অফিসের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করব এবং সেটি শিগগিরই ঠিক হবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। কেননা মেয়র বিল ডি ব্লাজিও বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশিদের প্রতি বেশ অনুরক্ত।’
নিউইয়র্ক নগরের বাসিন্দাদের ডাইভার্সিটি বা বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে ও সবাইকে নগর পরিচালনার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সর্বোচ্চ ব্যবহৃত ১০টি ভাষাকে অফিস বা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছে মেয়র অফিস। এসব ভাষার মধ্য বাংলা অন্যতম। মেয়র অফিসের অভিবাসী সম্পর্কিত দপ্তরটি এই বাংলা ভাষার প্রয়োগ এবং অন্যান্য প্রচারণার বিষয়গুলো দেখাশোনা করে। অনলাইন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১০টি ভাষার ২০ জন অনুবাদক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মেয়র অফিসে। সেখানেই ভুল মানুষ ঢুকেছে কিনা সেই প্রশ্ন বিশ্বজিৎ সাহার।
বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘ভুল যাওয়া একেবারেই অনুচিত। বানান সম্পর্কে অজ্ঞতাই এর মূল কারণ। সঠিক লোককে নিয়োগ করা হয় না অথবা ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার মতো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে এই অবস্থা। আবার মেয়র অফিসের এসব কাজ, হয়তো কোন করপোরেট অফিসকে দিয়ে করানো হচ্ছে, তারা গুগল থেকে অনুবাদ করতে গিয়ে এই ভুল করতে পারে। এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আমরা আরও সোচ্চার হব।’
অভিবাসী নির্ভর এই নগরে অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা চালু আছে। গেল সিটি নির্বাচনে বাংলায় ব্যালট ছিল চমক দেওয়ার মতো ঘটনা। শুধু তাই নয়, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি বিশাল কমিউনিটিকে মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে বাংলায় ভাব প্রকাশের জন্য। সে উদ্যোগে বাংলাদেশি কমিউনিটি অনেকখানিই গর্বিত ও ঋণী বর্তমান মেয়র অফিসের কাছে। তবে এসব যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে না বলে আক্ষেপ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0