default-image

প্রত্যেক স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নিজের ভৌগোলিক সীমানার সার্বিক উন্নয়নের অধিকার আছে। সেই অধিকার মাটি ও মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার মিশেলে উদ্দীপ্ত হয়ে জাতীয় কর্মযজ্ঞ হিসেবে পরিগণিত হয়। রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে উন্নয়নের প্রতিটি উদ্যোগই মাটি ও মানুষের সংরক্ষণ এবং বিকাশের লক্ষ্যেই পরিচালিত হবে—এটাই জাতীয় স্বার্থ। রাষ্ট্র যত ক্ষুদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে হীনবল হোক না কেন—বিদ্যমান জ্ঞান, উপাত্ত, সম্পদ ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা নিরূপণ ও নিশ্চিতকরণ একান্তই প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় স্বার্থে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চক্রান্ত জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করে থাকে যা মূলত মেধা, অর্থ, সময় ও প্রয়াসের অপব্যবহার-অপচয় করে থাকে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমস্বার্থ সমন্বিত সুসম্পর্কের বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অধিকার, এখতিয়ার ও প্রাপ্যতার বিষয়টি একান্তই মৌলিক। রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রকে কূটনৈতিকভাবে কৌশলী ও সক্ষম হতে হবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপরিচালনায় নিয়োজিত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের পরিপক্বতা, দক্ষতা, যোগ্যতার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ড. খালেকুজ্জামান (মতিন) তাঁর ‘নদী ও পরিবেশ ভাবনা’ বইয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উন্নয়নের মৌলিক বিষয়াবলি নিয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও যুক্তিনিষ্ঠ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন প্রস্তাব আকারে। আমরা তাঁর উপস্থাপিত নদীমাতৃক বাংলাদেশের উন্নয়নকৌশল ও ভাবনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে আলোকপাত করব।

বিজ্ঞাপন

কবাংলাদেশ বদ্বীপটির অতীব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো পানি। জনপদের মানুষের জীবনযাপন, লড়াই-সংগ্রাম ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার পুরোটাই পানিকেন্দ্রিক। খাল-বিল, নদ-নদী পরিবেষ্টিত পলিমাটির সিংহভাগ মানুষের জীবনযাত্রা পানিপ্রবাহের তারতম্যের সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে সম্পর্কিত। ‘নদী ও পরিবেশ ভাবনা’র ভূমিকায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জাতীয় সম্পদ নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ের উন্নয়নের নামে দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে হরিলুটের বিষয়টি যেমন উল্লেখ করেছেন, তেমনি উজানি প্রতিবেশী শক্তিশালী ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে অসম সম্পর্কের মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের অবমাননার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। ড. খালেকুজ্জামান তাঁর বইয়ে এগারোটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ ও তিনটি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আনু মুহাম্মদের ভূমিকায় উল্লিখিত রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার নানাদিক পাঠকসমাজের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পানি সংকটের সঙ্গে উজানের দেশ ভারতের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের সঙ্গে রয়েছে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। জাতিসত্তাগত অভিন্নতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈপরীত্যের কারণে বিশ্বস্বীকৃত ‘অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা’ গ্রহণের সীমাবদ্ধতাই পানি সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করে ড. খালেকুজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিক একক হিসেবে অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনাটি পানি ও পরিবেশ বিষয়ক অনেক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে সর্বসম্মতিতেই গৃহীত হয়েছে। তিনি পাঠকদের আরও জানান, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো: ১৯৭৭ সালের মার ডে প্লাটা বিষয়ক রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলন, ১৯৯২ সালের পানি ও পরিবেশ বিষয়ক ডাবলিন সম্মেলন, ১৯৯২ সালের রিও ডে জেনিরোর ধরিত্রী সম্মেলন, ১৯৯৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের আন্তঃনদী প্রবাহ কনভেনশন, ২০০১ সালে মিঠাপানি বিষয়ক বন সম্মেলন, ২০০২ সালে জোহানেসবার্গের টেকসই উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলন এবং ২০১৫ সালের রাষ্ট্রসংঘের গৃহীত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রভৃতিতে অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পানি সংকটের মূলে আছে গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় অবস্থিত ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ১৯৯৬-২০১৬ সময়কালে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ৬৫ শতাংশ পানি কম পেয়েছে বলে নেদারল্যান্ডস-কানাডা-বাংলাদেশ ভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে বলে খালেকুজ্জামান উল্লেখ করেন। ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অন্তরায় হলো অংশীদারত্বমূলক নদী ব্যবস্থাপনায় ন্যায্য ও সমন্বিত নীতিমালার সংকট। ভারত আজ পর্যন্ত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার জন্য কোন যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। একটি সমতাভিত্তিক সমঝোতা নীতির অনুপস্থিতির ফলে পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতার ইস্যুটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ নিয়ে খালেকুজ্জামান অনবদ্য আলোচনা করেছেন তাঁর বইয়ে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্রমোন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে নিয়ে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি বদ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহৎ পরিকল্পনা। এটি ৩০ বিলিয়ন ডলারের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী প্রকল্প বলে তিনি বইয়ে উল্লেখ করেন। কিন্তু পরিকল্পনার পরিব্যাপ্তি অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক তথ্য–উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি গৃহীত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয় উপাত্ত সংগ্রহের সুপারিশ করেছেন। তা ছাড়া তিনি পরিকল্পনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর বাঁধ নির্মাণে গঙ্গা ও যমুনা ব্যারেজ অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ফারাক্কা বাঁধের অকার্যকারিতার কথা স্মরণ করিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ভরাট ও দখল হওয়া খাল–নদী–নালা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেন। এ ছাড়া অমীমাংসিত যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা ও অনিশ্চিত পানি প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংক প্রণীত পানি উন্নয়ন বিষয়ক রিপোর্ট অনুযায়ী উজানের দেশের সঙ্গে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেন। বদ্বীপ পরিকল্পনার অপ্রয়োজনীয় বিশাল ব্যাপ্তি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা এবং সমন্বয়হীনতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেন।

আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত উন্নয়নের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ ছাড়া কোন উন্নয়নই টেকসই নয়। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মরণঘাতী ছোবল প্রমাণ করেছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ব্যতিরেকে মানুষের কোন উন্নয়নই টেকসই নয়। ড. খালেকুজ্জামান ১৯৫টি দেশ ও ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ নির্ধারিত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা, যা এজেন্ডা ২০৩০ বলা হচ্ছে, তা নিয়ে অর্থবহ আলোচনা করেন তাঁর বইয়ে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন ধারায় সুন্দরবনসহ সামগ্রিক পরিবেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। পরিবেশ উন্নয়ন সূচকে ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৯। স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের মৌলিক শর্ত পূরণ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প মানেই হলো জাতীয় অর্থনীতিতে লুটপাট।

নদী ও পরিবেশ ভাবনা বইয়ে হাওরের অকাল বন্যা ও সমাধান নিয়ে যেমন আছে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, তেমনি আছে সমাধানের রূপরেখা। আছে বিতর্কিত ও বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ, তিস্তা, ফারাক্কা এবং গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিল সমীকরণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতি বরাবরই ভারত-বাংলাদেশে প্রভাব ফেলে জনপ্রিয়তার রাজনীতিতে। বিহার বলে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলো, বাংলাদেশের ভারতবিদ্বেষ উসকে দিয়ে ফায়দা নেওয়া হয় রাজনীতিতে। রাজনীতির মারপ্যাঁচে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বরাবরই চাপা পড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

ড. খালেকুজ্জামান অপরাজনীতির এই দুষ্টচক্র ভেঙে পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পরিবেশ দূষণ, কয়লা নীতি, ন্যায্য সমুদ্র সীমা নিয়ে তিনি যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিবেশ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

‘নদী ও পরিবেশ ভাবনা’ বইটি ড. খালেকুজ্জামানের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সমন্বিত প্রকাশ। গভীর দেশপ্রেম ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে টেকসই স্থায়ী উন্নয়নের মহাসড়কে মাতৃভূমির সফল যাত্রার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর এই পরিশ্রমলব্ধ প্রয়াসে। সব উন্নয়নকর্মী এই বই থেকে পর্যাপ্ত স্বচ্ছ ধারণা লাভে সক্ষম হবে—এমন প্রত্যাশা আমরা করতে পারি।

ড. খালেকুজ্জামান মতিন (পরিবেশ বিজ্ঞানী, পানি সম্পদ, উপকূলীয় ভূতত্ত্ব, টেকসই উন্নয়ন ও জিআএস বিশেষজ্ঞ এবং পেনসিলভানিয়ার লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক।)

মন্তব্য পড়ুন 0