default-image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, রাজনীতির মাঠ তত উত্তপ্ত হচ্ছে। এই মুহূর্তে মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি বা প্রাথমিক বাছাই। ১৯ ফেব্রুয়ারি ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অন্য প্রার্থীদের তোপের মুখে পড়েন মাইকেল ব্লুমবার্গ।
এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্রেটিক দলের মোট নয়টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো ডেমোক্রেটিক বিতর্ক মঞ্চে উপস্থিত হন মাইকেল ব্লুমবার্গ। প্রথম দিনের এ অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হয়নি নিউইয়র্ক নগরের সাবেক এ মেয়রের জন্য। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া নানা পদক্ষেপ, বিভিন্ন সময় দেওয়া নানা বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে বিতর্ক মঞ্চে অন্য প্রার্থীদের তোপের মুখে পড়েন এ বিলিয়নার। একই সঙ্গে নির্বাচনে অর্থের খেলার জন্যও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন।
উত্তপ্ত এ বিতর্কের পরই অবশ্য প্রার্থীদের সবাই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচারের কাজে ছুটে যান। আগামী ৩ মার্চ বেশ কয়েকটি প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন নেভাদা, ক্যালিফোর্নিয়া, ইউটাহ, কলোরাডোসহ ১৪টি অঙ্গরাজ্যে প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আসছে ‘সুপার টিউসডে’-কে সামনে রেখে তাই সবাই ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে।
১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে ডেমোক্রেটিক দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে মাইকেল ব্লুমবার্গকে তাঁর বিভিন্ন সময়ে করা নানা বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। অনেক দোলাচলের পর গত নভেম্বরে নিজের প্রার্থিতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার পর এই প্রথম বিতর্ক মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ব্লুমবার্গকে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে বলা যায়। তবে শুরুর অস্বস্তি কাটিয়ে ভালোভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করেন তিনি। দাবি করেন, আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা তাঁরই রয়েছে।
বিতর্ক মঞ্চে বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন, অ্যামি ক্লোবুচার, জো বাইডেন ও পিট বুটেজেজ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সবাই এই মিডিয়া মুঘলকে বেশ একচোট নিয়েছেন। বিশেষত নির্বাচনী প্রচারে নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং এর মাধ্যমেই জনগণকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা নিয়ে ব্লুমবার্গের ব্যাপক সমালোচনা করেন তাঁরা। একই সঙ্গে উঠে আসে মেয়র থাকাকালে তাঁর গৃহীত কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপের কথা। এর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিন নাগরিকদের ফাঁদে ফেলে আটকে তাঁর প্রশাসনের গৃহীত বর্ণবাদী নীতি, নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সময় করা বাজে মন্তব্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
নবম এ বিতর্কে সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিলেন ম্যাসাচুসেটস সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশই মনে করে ১৯ ফেব্রুয়ারির এ বিতর্কে বিজয়ী হয়েছেন ওয়ারেনই। ওই দিন ওয়ারেনের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মাইকেল ব্লুমবার্গ। নারী বিষয়ে ব্লুমবার্গের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে ওয়ারেন বলেন, ‘আমাদের ভাবতে হবে, কার সঙ্গে লড়ছি আমরা। এমন এক শতকোটিপতির বিরুদ্ধে, যিনি নারীদের ‘বিপুলা’, ‘ঘোড়ামুখো লেসবিয়ান’ বলে উদ্ধৃত করেন। না আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলছি না। আমি (সাবেক) মেয়র ব্লুমবার্গের বিষয়ে কথা বলছি।’ শুধু তাই নয় ওয়ারেন নারী কর্মীদের সঙ্গে ব্লুমবার্গের নানা আচরণের ফিরিস্তিও তুলে ধরেন। ব্লুমবার্গ অর্থের বিনিময়ে প্রেসিডেন্সি কিনতে চান অভিযোগ তুলে এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেন, ‘একজন শতকোটিপতিকে সরিয়ে আরেকজন শতকোটিপতিকে আনাটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।’
একইভাবে স্যান্ডার্সও মাইকেল ব্লুমবার্গকে কাঠগড়া দাঁড় করান। তবে তাঁর আক্রমণের ধরনটি ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। কারণ, বরাবরের মতোই বিস্তর গবেষণা করেই মঞ্চে উঠেছিলেন স্যান্ডার্স। পিট বুটেজেজ ও জো বাইডেন দুজনই ওয়ারেন ও স্যান্ডার্সের বদৌলতে বেশ ভালো অবস্থানে ছিলেন এদিন। কারণ, প্রথম দুজনের বক্তব্যের কারণে সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যপন্থীদের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য ব্লুমবার্গ একা দাবিদার নন। খুবই ভালো বক্তা হিসেবে এরই মধ্যে ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জন করা বুটেজেজ অবশ্য বরাবরের মতোই স্যান্ডার্সকেই লক্ষ্যবস্তু করেন। তাঁর ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। স্যান্ডার্স যদি বামপন্থী প্রতিনিধি হন, তবে তিনিই একমাত্র মধ্যপন্থী বিকল্প, যার পক্ষে ভারমন্ট সিনেটরের বিজয়রথ থামানো সম্ভব।
নিজের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর এমন অস্বস্তিকর একটি দিনে একহাত নিতে ভোলেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘তিনি (ব্লুমবার্গ) তোতলাচ্ছিলেন, হাঁসফাঁস করছিলেন—সব মিলিয়ে অনুপযুক্ত মনে হয়েছে। নির্বাচনী লড়াই থেকে যদি এটি তাঁকে ছিটকে দিতে না পারে, তবে আর কিছুই পারবে না।’
বিতর্কের শেষে প্রার্থীদের প্রশ্ন করা হয় যে, শেষ পর্যন্ত ডেমোক্রেটিক সম্মেলনে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধির সমর্থন আছে, কিন্তু প্রাইমারিগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিদের সমর্থন নেই-এমন কারও মনোনয়ন পাওয়া যৌক্তিক হবে কিনা। বার্নি স্যান্ডার্স বাদে বাকি সবাই এটিকে ‘অযৌক্তিক’ হিসেবে মন্তব্য করেন। বলা প্রয়োজন যে, এখন পর্যন্ত ডেমোক্রেটিক মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা স্যান্ডার্সই সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধির সমর্থন পেতে যাচ্ছেন। যদিও প্রাইমারিগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা তাঁর কম। সে ক্ষেত্রে আসছে নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক কনভেনশনে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রশ্নে বড় ধরনের বিভাজন দেখা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আসছে নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে বের করতে তৃতীয় অঙ্গরাজ্য হিসেবে নেভাদা ককাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হবে ২৯ ফেব্রুয়ারি। ক্যালিফোর্নিয়া, ইউটাহ, কলোরাডোসহ মোট ১৪টি অঙ্গরাজ্যে প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হবে। তাই প্রার্থীরা প্রচার চালাতে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন। বিতর্কের পর নির্বাচনী প্রচারের কাজে ইউটাহ চলে যান ব্লুমবার্গ। পিট বুটেজেজ টাউনহল সভায় যোগ দিতে চলে যান লস অ্যাঞ্জেলেসে। আর লাস ভেগাসে আরেক টাউনহল সভায় ২০ ফেব্রুয়ারি যোগ দেন এলিজাবেথ ওয়ারেন ও জো বাইডেন, যা সিএনএনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আর মিনেসোটা সিনেটর ক্লোবুচার নির্বাচনী প্রচারের উদ্দেশ্যে ছুটে যান কলোরাডোয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0