default-image

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইনজীবীরা বলেছেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন আদালত একটি রাজনৈতিক নাটক ছাড়া কিছু নয়। ক্ষমতায় না থাকা একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন অভিশংসন বিচারের এখতিয়ার মার্কিন সিনেটের নেই। দেশের ক্ষত নিরাময়ের উদ্যোগ না নিয়ে, নিদেনপক্ষে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।

ট্রাম্পের অভিশংসন আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর প্রাক্কালে তাঁর আইনজীবীদের দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন আদালত বসছেন।

আদালতের কার্যক্রম নিয়ে সিনেটে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা সিনেটর চার্লস শুমার।

আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে বসার আগেই ট্রাম্পের আইনজীবীরা ৭৫ পৃষ্ঠার একটি বক্তব্য জমা দিয়েছেন। গতকাল সোমবার সকালে দেওয়া এই বক্তব্যের বিবরণীতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প আর দেশের প্রেসিডেন্ট নেই। ক্ষমতায় নেই—এমন কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন আদালত বসানোর এখতিয়ার আমেরিকার সংবিধান মার্কিন সিনেটকে দেয়নি।

গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে তাণ্ডব চালিয়ে হামলাকারীরা আইন ভঙ্গ করেছে। ট্রাম্পের বক্তৃতার কারণে ক্যাপিটল হিলে অনুপ্রবেশ, লুটপাট বা হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে আইনজীবীরা তাঁদের বিবরণীতে দাবি করেছেন।

আইনজীবীদের ভাষ্য, ট্রাম্প নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতি নিয়ে কথা বলেছেন, যা বলার অধিকার আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দ্বারা সংরক্ষিত।

আইনজীবীদের যুক্তি, ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের ‘ফাইট লাইক হেল’ বলে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। এই কথার মাধ্যমে তিনি জোরালো লড়াই চালানোর কথা বলেছিলেন। আইন লঙ্ঘন করার জন্য বলেননি।

সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন আদালতে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মামলা উপস্থাপনকারী অভিশংসন ম্যানেজারদের পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে এমন চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ পৃষ্ঠার জবাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতি নিয়ে ট্রাম্পের করা অভিযোগের কোনো ভিত্তি কোথাও পাওয়া যায়নি। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের আচরণে কারণে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার বহু প্রমাণ রয়েছে। নিজের কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই দেওয়ার মতো কোনো অজুহাত ট্রাম্পের নেই।

দায় থেকে উতরে যাওয়ার জন্য ট্রাম্প চেষ্টা করছেন বলে অভিশংসন ম্যানেজারদের পক্ষ থেকে দেওয়া জবাবে বলা হয়েছে।

ট্রাম্পের আইনজীবীদের দেওয়া বক্তব্যের পর অভিশংসন ম্যানেজারদের পক্ষে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ১০টার মধ্যে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য জমা দেওয়া হবে জানানো হয়েছে।

ট্রাম্প আগেই জানিয়েছেন, অভিশংসন আদালতে তিনি সশরীরে উপস্থিত হবেন না।

সিনেটে উভয় দলের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, উভয় পক্ষকে ১৬ ঘণ্টা করে সময় দেওয়া হবে।

অভিযোগ প্রমাণের জন্য ট্রাম্পের বিপক্ষে অভিশংসন মামলার প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অভিশংসন ব্যবস্থাপকেরা পাবেন ১৬ ঘণ্টা। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য ট্রাম্পের পক্ষের আইনজীবীরা পাবেন ১৬ ঘণ্টা। এসবের ফাঁকে যুক্তিতর্ক হবে। ভোট গ্রহণ হবে। প্রয়োজনে সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হবে।

ইতিমধ্যে বিচারকাজের জন্য শপথ নিয়েছেন মার্কিন সিনেটের ১০০ জন সদস্য। তাঁদের মধ্য থেকে উভয় পক্ষকে প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

সিনেটর চার্লস শুমার জানিয়েছেন, মঙ্গলবার শুরুতেই অভিশংসন আদালতের নিয়মনীতি নিয়ে ভোট গ্রহণ করা হবে। এরপরই বিচারের সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চার ঘণ্টার বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে সিনেট সদস্যরা ভোট প্রদান করবেন।

সিনেটর চার্লস শুমার বলেছেন, আদালতের কাঠামো নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যায়সংগত সমঝোতা হয়েছে। এর ফলে অভিশংসন বিচার সত্য উদ্‌ঘাটনসহ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে বলে তিনি মনে করছেন। তিনি জানান, আগামীকাল বুধবার দুপুরে অভিশংসন ব্যবস্থাপকেরা তাঁদের মামলা উপস্থাপন শুরু করবেন।

বিজ্ঞাপন

অভিশংসন ব্যবস্থাপকদের অনুরোধে আদালতে সাক্ষ্য উপস্থাপনের জন্য সংক্ষিপ্ত বিতর্ক ও ভোট গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী ডেভিড শোয়েন ইহুদিধর্মাবলম্বী। তাঁর অনুরোধে ধর্মীয় আচার পালনের জন্য আগামী শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার পর্যন্ত অভিশংসন আদালতের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হবে।

অভিশংসন আদালতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের নির্বাচনপরবর্তী ভোট জালিয়াতির ভুয়া দাবির ভিডিও ফুটেজসহ ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার সচিত্র প্রমাণ তুলে ধরা হবে।

৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও বর্তমান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির অফিস তছনছ করা হয়। ট্রাম্পের উন্মত্ত সমর্থকদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আইনপ্রণেতাদের টেবিলের নিচে পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ লোকজন মনে করেন, ৬ জানুয়ারির সহিংসতার দায়ভার ট্রাম্পের ওপরই বর্তায়। কারণ, তাঁর উসকানিতে এমন ঘটনা ঘটেছে। প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা অভিশংসন প্রস্তাবে এই বিষয়কেই সামনে নিয়ে আসা হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এ নিয়ে একটি জরিপ করেছে। ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, আমেরিকার তালিকাভুক্ত ৫৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ৬ জানুয়ারির ঘটনার জন্য ট্রাম্পের অভিশংসন দণ্ড ভোগ করা উচিত।

একই জরিপে উঠে এসেছে, ৫৮ শতাংশ লোকজন মনে করেন, ট্রাম্পকে ভবিষ্যতে কোনো ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন দণ্ড কার্যকর করতে হলে মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের প্রয়োজন। এমন সমর্থন পাওয়ার জন্য রিপাবলিকান পার্টির ১৭ জন সিনেটরকে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট প্রদান করতে হবে। এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচজন রিপাবলিকান সিনেটরকে ট্রাম্পের বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। যদিও প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সময় ১০ জন রিপাবলিকান সদস্য তাঁর পক্ষে ভোট দিয়ে নজির সৃষ্টি করেছিলেন।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন দণ্ড কার্যকর না করা গেলেও সিনেটে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে তাঁকে ভবিষ্যতে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার রাজনৈতিক চেষ্টা চলছে।
মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে বলা আছে, সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা বা সরকারবিরোধী সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী হলে কোনো ব্যক্তি মার্কিন সরকারের কোনো দায়িত্বশীল পদ গ্রহণের অযোগ্য হবেন।

নিদেনপক্ষে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী আরোপ করে ট্রাম্পকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে সমর্থন পাওয়ার আশা করছেন ডেমোক্র্যাটরা।

প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান ও অন্যতম অভিশংসন ব্যবস্থাপক অ্যাডাম সচিফ বলেছেন, আদালত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ৬ জানুয়ারি ঘটনার ১০০ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত থাকবেন। এ কারণে বাইরে থেকে কোনো সাক্ষী তলবের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার সময় নির্বাচন নিয়ে শেষ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন চলছিল। ট্রাম্পের অভিশংসন আদালতে উপস্থিত জুরি হিসেবে কাজ করা অধিকাংশ সিনেটরই সেদিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা নারকীয় সেই তাণ্ডব নিজেরাই দেখেছেন। ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁদের অনেককেই সেদিন লুকাতে হয়েছিলেন। আইনপ্রণেতাদের রক্ষা করতে গিয়ে ক্যাপিটল হিলের একজন পুলিশ কর্মকর্তারও মৃত্যু হয়।

ট্রাম্পের প্রথম দফা অভিশংসনের সময় আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন অ্যাটর্নি এলেন ডারশোইটিজ। তাঁর মতে, ট্রাম্পের আইনজীবীরা ৬ জানুয়ারির ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার যে কৌশল নিয়েছেন, তা ঠিক না।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক জনাথন টারলই বলেছেন, ট্রাম্পের অভিশংসন আদালতে বহু উত্তাপ ছড়াবে। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি তাদের নিজেদের সমালোচনা নিয়েই আদালত সরগরম করবে। যদিও রাজনৈতিক এই উত্তাপে কোনো পক্ষেরই মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হবে না বলে তিনি মনে করেন।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন