জর্জকে বলা মিসরীয় বন্ধুর জীবনের গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

মোবারক আর জর্জ আমার দুই সহকর্মী। উৎসব আয়োজনের ফাঁকে আমরা একসঙ্গে বসি। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই সহকর্মীদের নানা কথাবার্তায় ডুবে থাকতে মন চায়। আমেরিকার মাটির খাঁটি সন্তান জর্জ। ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকান কোনো ঘরানায় তাঁকে ফেলা যায় না। কোরীয় যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে নিঃসন্তান জর্জ চমৎকার করে জীবনের কথা বলেন। তাঁর কথা শুনে, তাঁর সঙ্গে তর্ক করে বেশ মজা পাওয়া যায়। 

মোবারক মিসর থেকে আসা অভিবাসী। জীবনের ৪০ বছর আমেরিকায় কাটিয়েছেন। এখানেই এক বিয়ে করেছেন। বছর দুয়েক পর মিসরে যান। জর্জের ধারণা, মোবারকের মিসরে আরেক বউ আছে। এ নিয়ে মোবারককে প্রশ্ন করে কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। হাসতে হাসতে বলেন, আমি তো চার বিয়ে করতেই পারি! জর্জ দ্রুতই বলেন, নট ইন আমেরিকা মাই ফ্রেন্ড!


দুই বিপরীত চরিত্রের লোক। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তাঁরা একজন আরেকজনকে টিপ্পনী কাটেন। তর্ক করেন। জড়িয়ে ধরেন একজন আরেকজনকে বন্ধুত্বের নির্মল আলিঙ্গনে। এভাবেই দেখে আসছি বহু বছর থেকে।


তো এ সপ্তাহে এসেই মোবারক জানালেন, তিনি খামারে গিয়ে নিজ হাতে পশু জবাই করে এসেছেন। এমন জবাইয়ের মধ্য দিয়ে পশুত্বকে হত্যা করা হয়। নিজের পাপবোধকে বিসর্জন দেওয়া হয়। জর্জ সাধারণত ধর্ম নিয়ে কোনো তর্ক বা আলোচনায় সহজে যেতে চান না। আমেরিকানদের সাধারণ ভদ্রতা এ বিষয়টি। তবুও ফোড়ন কাটেন।


বললেন, মোবারক-তোমাকে দেখছি গত ২০ বছর থেকে। প্রতিবছরই এমন পশু তুমি জবাই করে আসো। তোমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন তো আমি দেখি না। আগেও যেমন মিথ্যে কথা বলতে, আজও বলছ। আগামীকালও বলবে।


জর্জ প্রায়ই মোবারকের প্রশংসা করেন। বলে থাকেন, মোবারক আমার খুব ভালো বন্ধু। একটাই দোষ-খালি মিথ্যে কথা বলে! জর্জের ধারণা, মোবারক সত্য কথা খুব কমই বলে। কেবল বিপদে পড়লেই সত্য কথা বলে।


কথাটি শুনেই মোবারক এবার হামলে পড়লেন জর্জকে একহাত নেওয়ার জন্য। বললেন, ট্রাম্পকে যারা নেতা মানে, তাদের কাছ থেকে সত্যবাদিতার সার্টিফিকেট আমার নিতে হবে না।


না থেমেই মোবারক বলতে থাকলেন, চরম একটা মিথ্যেবাদী লোককে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে আমরা আমেরিকান বলে দম্ভ করি। এ লোকের জন্য এখন আমেরিকায় থাকাটাই লজ্জার হয়ে গেছে!


জর্জ আবারও ফোড়ন কাটেন, চলে যাবে নাকি! তোমার তো মিসরে গেলেও অসুবিধা নাই। ওখানে সংসার আছে। আরেকটা বউ আছে। হয়তো একটার বেশিও আছে! এবারে মোবারক রীতিমতো খেপে গেলেন।: দেশটা কেবল তোমাদের সাদাদের নয়। এই দেশ আমাদের মতো ইমিগ্রান্টরা বানিয়েছে। এ দেশ থেকে চলে যাওয়ার কথা আসছে কেন? 

আমেরিকান ভদ্রলোক জর্জ তর্কে গেলেন না। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বাদ দাও এসব। বলো এবার সপ্তাহান্তে পরিবারের সঙ্গে কেমন কাটল। আমেরিকা ওয়াজ অলওয়েজ গ্রেট অ্যান্ড উইল রিমেইন গ্রেট!
মোবারক একদম থেমে গেলেন। চুপ করলেন কিছুক্ষণ।


পানীয়তে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে শুরু করলেন, আর বলো না! শনিবার সারা দিন যা ঘটল তা নিয়ে কথা বলার জন্যই আসলাম। তুমি আমার মুডটাই আরও অফ করে দিলে জর্জ।
বন্ধু, আমি দুঃখিত। তুমি তোমার উইকেন্ডের বিবরণ দাও। শুনে ধন্য হই।মোবারক আবারও চুমুক দিলেন। 

মোবারক শুরু করলেন, স্ত্রীর অভিযোগ, আমি নাকি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি আজকাল বেশি। পরিবারকে একদম সময় দিই না। তো সিদ্ধান্ত নিলাম শনিবার দিনটা পরিবারকে দেব।
জর্জ তাঁর গ্লাসে চুমুক দিয়ে ফোড়ন কাটেন, এ বয়সে নতুন ছেলে পুলে নাতনি তো! আগের তথ্য অনুযায়ী তোমার বউ, এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে সুখী পরিবার! মোবারক গায়ে মাখলেন না। কথা চলতে চালিয়ে যাতে থাকলেন।

 শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেই কফি বানিয়ে খেলাম। এদিক-ওদিক দেখে সোফায় শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। স্ত্রী উঠলেন নটার কিছু পর। আমার দিকে তাকালেন একবার। জিজ্ঞেস করলেন, কফি লাগবে কি না। জানালাম কফি পান করে ফেলেছি। ব্যাগল টুইস্ট করে ব্রেকফাস্টও করে ফেলেছি। স্ত্রী তার ব্রেকফাস্ট করলেন। কার সঙ্গে যেন ফোনে মনোযোগ দিলেন। হাতে ট্যাব নিয়ে ইউটিউবে একটা রান্নার চ্যানেল দেখতে শুরু করলেন। ঘণ্টা খানিক এভাবেই যাওয়ার পর বউ আসলেন। ঝাড়ি দিয়ে বললেন, শুয়ে আছ কেন সোফাতে! বলেই আবার তিনি কিচেনের দিকে চলে গেলেন।

মোবারক বলছেন : এবারে আমি ভাবলাম পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য সোফায় শুয়ে থাকা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। বসে পড়লাম। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর আবার স্ত্রী আসলেন। বললেন, বসে আছ কেন? টিভি ছাড়ো। আমার টিভি দেখার কোনো ইচ্ছে নেই। আমি পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য আজ উদ্‌গ্রীব! তা ছাড়া টিভি আর সাউন্ড সিস্টেম, কেবল বক্স মিলে চারটা রিমোট কন্ট্রোল টেবিলে। আমি নিশ্চিত নই কোনো রিমোট কন্ট্রোলে টিপ দিয়ে টিভি অন করব। 

স্ত্রী নিজেই টিভি ছেড়ে দিলেন একটা হুম আওয়াজ দিয়ে! পর্দায় তখন ডোনাল্ড ট্রাম তাঁর ইমিগ্রেশন নিয়ে নতুন চাল দিচ্ছেন। এই বিরক্তিকর চেহারাটা দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আরও। স্ত্রী আবার চলে গেলেন কিচেনের দিকে। তার ফোন এসেছে। আমি ট্রাম্পের সামনে বসা। এ সময় আমার ২২ বছরের ছেলে ধপাস ধপাস করে দোতলা থেকে নেমে এল। মোবারক 'ভি' সাইন দেখিয়ে বললেন, ছেলে আমার দুই আঙুল ওপরে তুলে বলল, হাই ড্যাডি!

মোবারক বলছেন, আই অ্যাম ডুইং গ্রেট মাই সান বলার আগেই ছেলেটি বেরিয়ে গেল। শুনলাম আমার পুরোনো মার্সিডিজটা গর্জন করে আওয়াজ তুলল। তার মানে ছেলে কোথাও যাচ্ছে।
স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে কই যাচ্ছে। জানালেন, স্টারবাকসে যাচ্ছে। আমি গাড়ির গর্জন মিইয়ে যাওয়া পর্যন্ত কান পেতে থাকলাম! ট্রাম্প তখনো বক্তৃতা দিচ্ছেন। যারা সামর্থ্যবান তারাই আমেরিকা আসবে, কথাটি বলছেন। আমি একটা রিমোট হাতে নিয়ে টিভি বন্ধ করতে চেষ্টা করলাম। বন্ধ হলো না। কেবল বক্স থেকে প্লে স্টেশন কানেকশনে চলে গেল! স্ত্রী এসে বললেন, এখন গেম খেলবে নাকি! জবাব কি দেব-এমন ভাবছিলাম। এমন সময় ওপর থেকে আমার ১৭ বছরের কন্যা নেমে আসল।
বললাম, মা এসো। আমার মেয়ে তখন মোলায়েম কণ্ঠে জানাল, ড্যাডি আই হাভ এন ইম্পর্ট্যান্ট শো টু ওয়াচ!

আমি সোফাতে আরও কিছুক্ষণ বসে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। আবার স্ত্রী আসলেন। তিনি রান্না করছেন। ভাবলাম, স্বামী ঘরে মনে করে বেচারা ভালোমন্দ কিছু রান্না করছে হয়তো। বহুদিন ঘরে বানানো ঝাল চিকেন খাই না! 

অনেকক্ষণ পড়ে স্ত্রী আসলেন। আমি তখন অনেকটাই নিদ্রাগামী। জানালেন, উইকেন্ডে তার একটা প্রোগ্রাম আছে। এ কারণে পরের সপ্তাহের রান্নাটি সেরে নিয়েছেন। আজ সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে গেলে কেমন হয়?
মোবারক বলছেন, আমি দ্রুত সাড়া দিলাম। এর মধ্যে ছেলে ফিরে এসেছে। মেয়েরও টিভি শো শেষ হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে তেমন আর কথাবার্তা কারও হয়নি। কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া যায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে মেয়ে আমার জানাল সে গেলে ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে যাবে। ছেলের আওয়াজ, ইথিওপিয়ার রেস্তোরাঁয়। তাদের মা জানালেন, এসব আজেবাজে খাবারে তিনি নেই। গেলে লেবানিজ রেস্তোরাঁয় যেতে হবে। আমার কোনো পছন্দ আছে কি না, কেউ জিজ্ঞেস করল না।পরিবারের তিনজনের চরম মতপার্থক্য নিয়ে আমি গাড়িতে চাপলাম। উঠেই যে যার ফোন চালু করে এয়ার ফোন কানে গুঁজে দিল। আমি ডাউন টাউনের দিকে গাড়ি চালাতে থাকলাম। 

মোবারক বলছেন, মনটা দেশজ খাবারের জন্য টানছিল। উঠের মাংস দিয়ে বানানো কাবাব খাইনি বহুদিন। গাড়ি চলছে ডাউন টাউনের দিকে। সবাই যার যার ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত। কানে এয়ারফোন। স্ত্রী চেয়ে আছেন তাঁর হাতে রাখা ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে। আমি মিররে আমার সন্তানদের, স্ত্রীর মুখ দেখার চেষ্টা করি। বোঝার চেষ্টা করি, আমরা কি কেউ কারও কথা আর শুনছি? কেউ কি আর কাউকে দেখছে আজকাল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে? ভাবলাম, দিনটা পরিবারকে ভালোই দিলাম। সব উবার ড্রাইভারতো আমার মতো ভালো ড্রাইভ করতেও পারে না!


জর্জ হজম করলেন কিছুক্ষণ। চেয়ে থাকলেন পুরোনো বন্ধুর দিকে। প্রশ্ন করলেন, লাঞ্চ কোথায় হলো শেষ পর্যন্ত? ডাউন টাউনের নতুন চালু হওয়া ফাস্ট ফুডের দোকানে! এক বেলা খাবারের জন্য কোনো রেস্টুরেন্টে যাব-এ নিয়েই আমরা একমত হতে পারলাম না! আমাদের উপযুক্ত আহার আমেরিকার ফাস্ট ফুড! এই হলো পরিবারকে দেওয়া আমার উইকেন্ড, মাই ফ্রেন্ড!-বলেই হো হো করে আসতে থাকলেন মোবারক। হাসতে থাকলেন জর্জও। একপর্যায়ে তাদের হাসি কান্নার মতো শোনায়। জর্জ আবারও পানীয় অর্ডার করেন! আর বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বিটলস–এর গান থেকে আওড়াতে থাকলেন,
All the lonely people
Where do they all come from?
All the lonely people
Where do they all belong? #

ইব্রাহীম চৌধুরী, নিউইয়র্ক
ibrahim.chowdhury@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন