default-image

১৯ বছরে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে নিউইয়র্কের মাটিতে পা রেখে জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নিশাতের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। পুরো নাম নিশাত ফারজানা খাজা। ১৯ বছরের সহজ সরল তরুণী এখন নিউইয়র্কের এক পাবলিক স্কুলের ‘মেইন টিচার’ হিসেবে কাজ করছেন। ১০ বছর ধরে তিনি এই পেশায়। নিউইয়র্ক ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনের এলিমেন্টারি স্কুলের টিচার হলেন নিশাত।
নিউইয়র্কে আমাদের মতো অনেকে আছেন, যারা পাবলিক বা প্রাইভেট স্কুলে টিচিং পেশার সঙ্গে যুক্ত। যারা আসলে ‘টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কাজ করেন। মূল টিচারকে ক্লাসের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করাই তাদের কাজ। কিন্তু মূল টিচার হিসেবে কাজ করতে হলে তাকে অবশ্যই টিচিংয়ের ওপর চার বছরের ডিগ্রি থাকতে হবে। নিশাত সেটিই অর্জন করেছেন। নিউইয়র্কের স্কুলগুলোতে মূল টিচারেরা যেমন স্কিলড, তেমনি তাদের বেতনও অনেক বেশি। তাই যারা মূল টিচার হতে চান, তারা নিশাতের অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারেন।
নিজেকে নতুন দেশ ও নতুন ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিশাতের শুরুটা ছিল ওর ভাষায় ‘অড জব’ দিয়ে। যদিও এই দেশে অড জব বলে কোনো কথা নেই। যেকোনো কাজকেই সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়। প্রকৃতপক্ষে যে সব চাকরি করতে গেলে কলেজে পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিতে হয় না, তাকেই এ দেশে সাধারণত অড জব হিসেবে ধরা হয়। নিশাতের শুরুটা ছিল ‘সিভিএস ফার্মেসি’ দিয়ে। সারা দিন হাড় ভাঙা খাটুনির পরে বাসায় ফিরে নিজেকেই প্রশ্ন করতেন, ‘এই কি আমি? এটাই কি আমার জীবনের গন্তব্য?’
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে নিশাত হয়ে গেলেন দুই সন্তানের মা। একটু থিতু হওয়ার পরে নিজেকে নিজে বললেন, ‘আর না। সামনে এগোতে হবে।’
কিছুটা ভয়, কিছুটা সংকোচ, সংশয় নিয়ে নিশাত এক সময় শুরু করল দুই বছরের কলেজ অ্যাসোসিয়েটেড ডিগ্রি। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। স্বামীর অফিসের আর সন্তানদের স্কুলের রুটিনের সঙ্গে নিজের রুটিন মেলানো। কিন্তু শেষ হলো। কলেজের চৌকাঠ পার হলো নিশাত অবশেষে। ক্রমে ফিরে পেতে লাগল সাহস, আত্মবিশ্বাস ও নিজেকে আরও এগিয়ে নেওয়ার, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ পার হওয়ার শক্তি। এভাবে এগিয়ে গেল আরও চারটি বছর। স্বামীর সহযোগিতা আর সন্তানদের ভালোবাসায় মাথায় উঠল কালো সেই ক্যাপ, পেয়ে গেলেন তিনি এ দেশের সবচেয়ে বড় ডিগ্রি—মাস্টার অব সায়েন্স ইন এডুকেশন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন নিশাত এলিমেন্টারি স্কুলের টিচার হিসেবে। এই নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই তো ১০ বছর পথ চলছি। একজন সফল শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলেছি আমেরিকায় নিজের ভবিষ্যৎ। নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছি। নিজের পায়ের তলার মাটিকে করেছি মজবুত।’
জীবনের এই পরিণত সময়ে এসে ‘জব’ ও ‘ক্যারিয়ার’ নিয়ে নিশাতের ভাবনা খুব স্পষ্ট। তাঁর কাছে জব হলো সেই কাজ, যেটা করে কোনোমতে নিজের জীবনটা চালিয়ে নেওয়া যায়, নিজের সাধারণ প্রয়োজন মেটানো আর কি! কিন্তু প্রকৃতপক্ষের নিজের মেধার কোনো বিকাশ ঘটায় না। তদুপরি জব থেকে যে আয় হয়, সেটা দিয়ে বেশির ভাগ সময় নিজের শখ-আহ্লাদ ও প্রয়োজনগুলো মেটানো সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে ক্যারিয়ারের অর্থ অনেক বড়, অনেক গভীর যা এনে দিতে পারে জীবনে পরিপূর্ণতা ও পূর্ণ করতে পারে জীবনের অনেক দেখা-না দেখা স্বপ্ন। যাকে বলে ‘ওয়াক অব লাইভ’। ক্যারিয়ারকে সহজ বাংলায় পেশা বলা যেতে পারে। যে পেশা আপনাকে দেবে আপনার পরিচিতি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0