default-image

আলবার্ট আইনস্টাইন একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। শুধু ঊনবিংশ শতাব্দীই নয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী তিনি। ১৯০৫ সালে তাঁর আলো, মধ্যাকর্ষণ, গতি, ভর এবং শক্তি সম্পর্কে তত্ত্বগুলো বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এগুলো বিগ-ব্যাং তত্ত্বের সূত্রপাত ঘটায়, যা মহাবিশ্বের জন্ম কীভাবে হয়েছিল এবং ব্ল্যাকহোল ও অন্ধকার শক্তির মতো ধারণাগুলোর দিকেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। বর্তমান অনেক মহাকাশ বিজ্ঞান প্রকল্প আইনস্টাইনের বিখ্যাত কাজগুলো এবং নাসার ‘বিয়ন্ড আইনস্টাইন’ গবেষণা কর্মসূচিতে নির্মিত।

১৪ মার্চ আমাদের বিজ্ঞানের নতুন যুগের সূচনাকারী আলবার্ট আইনস্টাইনের ১৪২তম জন্মদিন। ১৮৭৯ সালের এই দিনটিতে তিনি জন্মেছিলেন জার্মানির ওয়ার্টেমবার্গের উল্‌মে। আইনস্টাইনের বাবা-মা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত ইহুদি। তার মা পলিন কোচ।

জন্মের ছয় সপ্তাহ পর আইনস্টাইনের পরিবার মিউনিখ শহরে চলে আসেন। সেখানেই তিনি লুইটপোল্ড জিমনেসিয়ামে স্কুল শুরু করেন। পরে তাঁর বয়স যখন ১৫ বছর, তখন পরিবারের সঙ্গে ইতালি চলে যান। আলবার্ট সুইজারল্যান্ডের আরাউতে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে এবং গণিতের শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য জুরিখের সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০১ সালে তিনি ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই বছর তিনি সুইস নাগরিকত্ব লাভ করেন। এ সময় তিনি শিক্ষকতায় ঢুকতে না পেরে সুইস পেটেন্ট অফিসে প্রযুক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯০৫ সালে তিনি তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিজ্ঞাপন

পেটেন্ট অফিসে থাকাকালে অতিরিক্ত সময়ে আইনস্টাইন বেশির ভাগ লক্ষণীয় গবেষণামূলক কাজ করেছিলেন। ১৯০৮ সালে তিনি বার্নে প্রাইভেটডোজেন্ট নিযুক্ত হন। ১৯০৯ সালে তিনি জুরিখে অধ্যাপক হন। ১৯১১ সালে প্রাগের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হন এবং পরের বছর একই রকম পদে নিয়োগ পেয়ে জুরিখে ফিরে আসেন। ১৯১৪ সালে তিনি কায়জার উইলহেম ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তিনি ১৯১৪ সালে জার্মান নাগরিকত্ব অর্জন করেন এবং ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি বার্লিনে অবস্থান করেন। সে সময় তিনি রাজনৈতিক কারণে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং প্রিন্সটনের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। তিনি ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন এবং ১৯৪৫ সালে অবসর নেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আইনস্টাইন বিশ্ব সরকার আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। তাঁকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ড. চেইম ওয়েজম্যানের সঙ্গেও তিনি সহযোগিতা করেছিলেন।

আইনস্টাইন সর্বদা পদার্থবিদ্যার সমস্যা ও সমাধানে দৃঢ় সংকল্প থাকতেন এবং এসব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতেন। তাঁর লক্ষ্যের মূল পর্যায়ে পৌঁছাতে তিনি নিজস্ব কৌশল অবলম্বনে নতুন সব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বড় সাফল্যগুলোকে পরবর্তী অগ্রগতির সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতেন।

আইনস্টাইনের গবেষণাগুলো খুব দীর্ঘ। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি (১৯০৫), রিলেটিভিটি (ইংরেজি অনুবাদসমূহ, ১৯২০ এবং ১৯৫০), জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি (১৯১৬), ইনভেস্টিগেশন অন থিওরি অফ ব্রাউনিয়ান মুভমেন্ট (১৯২৬) এবং দা ইভোলিউশন অফ ফিজিকস (১৯৩৮)। তাঁর অ-বৈজ্ঞানিক রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—জায়োনিজম (১৯৩০), হুয়াই ওয়ার (১৯৩৩), মাই ফিলোসফি (১৯৩৪) এবং আউট অফ মাই লেটার ইয়ার (১৯৫০) সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তার অন্যান্য অবদানের মধ্যে রয়েছে আপেক্ষিকতাভিত্তিক বিশ্বতত্ত্ব, পরিসংখ্যানিক বলবিজ্ঞানের চিরায়ত সমস্যাসমূহ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বে তাদের প্রয়োগ, কৈশিক ক্রিয়া, অণুর ব্রাউনীয় গতির একটি ব্যাখ্যা, আণবিক গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আণবিক ক্রান্তিকের সম্ভাব্যতা, নিম্ন বিকিরণ ঘনত্বে আলোর তাপীয় ধর্ম (যা ফোটনতত্ত্বের ভিত্তি রচনা করেছিল) বিকিরণের একটি তত্ত্ব যার মধ্যে উদ্দীপিত নিঃসরণের বিষয়টিও ছিল, একটি একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্বের প্রথম ধারণা এবং পদার্থবিজ্ঞানের জ্যামিতিকীকরণ।

আলবার্ট আইনস্টাইন বহু ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং দর্শনে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ১৯২০ সালের দিকে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও দূর প্রাচ্যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাকে বিশ্বজুড়ে সব শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক একাডেমির ফেলোশিপ বা সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির কোপলে পদক এবং ১৯৩৫ সালে ফ্রাঙ্কলিন ইনস্টিটিউটের ফ্রাঙ্কলিন পদকসহ তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

১৯০৩ সালে আইনস্টাইন মিলিভা মেরিককে বিয়ে করেছিলেন। সংসারে তাদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে ছিল। ১৯১৯ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং একই বছর তিনি তাঁর কাজিন এলসা লভেন্থালকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি ১৯৩৬ সালে মারা যান। তারপর তিনিও ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল নিউজার্সির প্রিন্সটনে মারা যান।

আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ শ্মশান হলেও মস্তিষ্ক রেখে দেওয়া হয়। প্রিন্সটন হাসপাতালের রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. থমাস এসহার্ভে আইনস্টাইনের মৃত্যুর পরপরই তাঁর মাথা থেকে মস্তিষ্ক সরিয়ে ফেলেছিলেন। এরপর, বছরের পর বছর ধরে সে মস্তিষ্কে যা ঘটেছিল, তা এক রহস্য।

আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের ওজন মাত্র ১ হাজার ২৩০ গ্রাম ছিল, যা গড়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মস্তিষ্কের (প্রায় ১ হাজার ৪০০ গ্রাম) চেয়ে কম। গবেষকরা আরও বলেন, আইনস্টাইনের সেরিব্রাল করটেক্সের (৯ অঞ্চল) পুরুত্ব পাঁচটি নিয়ন্ত্রণের মস্তিষ্কের চেয়ে পাতলা ছিল। তবে আইনস্টাইনের মস্তিষ্কে নিউরনের ঘনত্ব বেশি ছিল।

এখনো নিউজার্সির প্রিন্সটন শহরে আইনস্টাইনকে স্মরণ করে একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকে। অ্যান্টনি ইলিয়াকোস্টাস অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো পরিচালনা করেন। তিনি দিনব্যাপী ফেসবুক লাইভ ব্যবহার করে নানা অনুষ্ঠান প্রচার করেন।

বিজ্ঞাপন
উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন