ইউরোপ মহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে অবস্থিত তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর পর্যটকদের কাছে বরাবরই আকর্ষণীয় এক শহর। সম্প্রতি সপরিবারে নিউইয়র্ক থেকে রিয়াদ যাচ্ছিলাম। পথে আট ঘণ্টা যাত্রাবিরতিতে ঘুরে দেখার সুযোগ হলো ছবির মতো সুন্দর ও দুই মহাদেশের মোহনায় অবস্থিত ঐতিহাসিক এই শহর।
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর সুন্দর, পরিপাটি ও আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর। পর্যটক আকর্ষণে সেখানে রাখা হয়েছে নানা ব্যবস্থা। চকচকে তকতকে ফ্লোর। যে কেউ চাইলে মেঝেতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিতে পারবে। রয়েছে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা। সঙ্গে রাখা হয়েছে যাত্রীদের বসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও। রয়েছে রকমারি পণ্যের আউটলেট। যাত্রীরা চাইলে তাদের ল্যাপটপ কিংবা মোবাইল চার্জ দিতে পারছে অনায়াসে। কোথাও কোনো ধুলাবালি নেই। বিমানবন্দরটিতে রয়েছে ফুড কোর্ট ও ট্যাক্স ফ্রি শপ। বাইরের তকতকে ঝকঝকে পরিবেশের মতোই সুন্দর রেস্ট রুমগুলো। আমাদের দেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে এমন পরিবেশ সচরাচর চোখে পড়ে না। কিছু দেশের বিমানবন্দরের রেস্ট রুম তো এমনকি ব্যবহারযোগ্যই নয়। পানি ফেলে পুরো ফ্লোর অপরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়।
সময় তখন বিকেল ৪টা। বিমানবন্দর থেকে পোর্ট ভিসা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। সঙ্গে স্ত্রী সৈয়দা রোহেনা আহবাব ও একমাত্র ছেলে রাইয়ান মোজাহিদ। বের হয়ে সাহায্য নিলাম টুরিস্ট গাইডের। জানার চেষ্টা করলাম এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো কীভাবে কম সময়ে দেখা যায়। খুঁজতে গিয়ে ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে পেয়ে গেলাম এক স্মার্ট গাইডও। তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে পর্যটকদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান; নাম মোহাম্মদ সাইদ। তুরস্ক বংশোদ্ভূত মধ্যবয়সী মুসলিম। আলাপে জানা গেল, সাইদের বয়স ৪৮ বছর। দু ছেলের বাবা। এ পেশায় আছেন আট বছর ধরে। আমি নিউইয়র্ক থেকে এসেছি শুনে ইংরেজিতে বললেন, ‘শুনেছি নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে প্রচুর পয়সা আয় হয়।’ আমি কিছু না বলে মনে মনে ভাবলাম, ‘নিউইয়র্কের ট্যাক্সিচালকেরা বলেন, তাঁরা সুখে নেই। ট্যাক্সি শিল্পের আগের সেই রমরমা ভাব নেই। আর তিনি বলছেন, নিউইয়র্কে এই পেশায় অনেক ইনকাম করা যায়। কথায় আছে না, ‘নদীর এপার কয় ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস।’ মোহাম্মদ সাইদের সঙ্গে আলাপ করে তাঁকে ৫ ঘণ্টার জন্য চুক্তিবদ্ধ করে ফেললাম। এই পাঁচ ঘণ্টা তিনি আমাদের নিয়ে ইস্তাম্বুলের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখাবেন। এ জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে তাঁকে দিতে হবে ৫০০ তুর্কি ইয়ার, যা ১০০ মার্কিন ডলারের সমমূল্যের।
সাইদ আমাদের নিয়ে ছুটে চললেন সিটির দিকে। বিমানবন্দর থেকে মূল ইস্তাম্বুল শহরের দূরত্ব গাড়িতে ৪০ মিনিটের পথ। হাইওয়ের দু পাশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি ও ফুলের সমাহার পুরো শহরের পরিবেশকে সুন্দর করে তুলেছে। গাড়ি চালাতে চালাতেই ইস্তাম্বুলের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখাচ্ছিলেন সাইদ। ইস্তাম্বুল শহরটি উঁচু-নিচু টিলাবেষ্টিত; অনেকটা মক্কা নগরীর মতো। দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সুলতান আহমদ মসজিদ অন্যতম। আমাদের গাইড শহরে ঢুকেই প্রথমে আমাদের নিয়ে গেলেন সুলতান আহমেদ মসজিদ বা ব্লু মস্ক দেখাতে। এটি শুধু মসজিদ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে বিশাল কমপ্লেক্স। মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক একরের বিশাল পার্ক। এই মসজিদের অনেক গল্প ছাত্রজীবনে শুনেছি।

default-image

ইসলামের ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তুরস্কের মুসলমানদের ইতিহাস আমাদের পাঠের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এবার স্বচক্ষে দেখে অভিভূত হলাম। ইস্তাম্বুলকে ইউরোপে মসজিদের শহর বলা হয়। কথিত আছে উসমানী সুলতান প্রথম আহমেদ ১৬০৯ সাল থেকে ১৬১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদে একসঙ্গে দশ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। এই মসজিদের ভেতরে প্রবেশ না করলে বোঝা যাবে না যে, এটি কতটা চিত্তাকর্ষক। কালের বিবর্তনে মসজিদটি এখন পরিণত হয়েছে তুরস্ক সভ্যতার অন্যতম এক পীঠস্থানে। এর মূল গম্বুজের পাশাপাশি রয়েছে আরও আটটি ছোট-বড় গম্বুজ। গম্বুজ ও মিনারগুলো নীল ও সাদা সীসার গাঁথুনিতে তৈরি। ওপরের অংশের রয়েছে সোনালী রঙের নকশা। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলোতে রয়েছে বাহারি কারুকাজ। নকশার পাশাপাশি পবিত্র কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি চোখ জুড়িয়ে দেয়। মসজিদের চারপাশে রয়েছে মাদ্রাসা, হলরুম ও এতিমখানা। রয়েছে অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা। রাতে যখন বিভিন্ন রঙের বাতির আলো মসজিদের মূল গম্বুজ ও মিনারে গিয়ে পড়ে, তখন পুরো এলাকা অপূর্ব সুন্দর হয়ে ওঠে। মসজিদের চারপাশে রয়েছে অনেকগুলো স্টুডিও ও গিফটশপ। স্টুডিওতে পুরোনো আমলের অনেক দুর্লভ তৈজষ সামগ্রী পাওয়া যায়। পর্যটকেরা এখানে এসে সুলতান আমলের পোশাকপরিচ্ছদ পরে ছবি তোলে। গাইড জানালেন, চোখ জুড়ানো স্থাপত্যশৈলী ও মসজিদসংলগ্ন বিশাল উদ্যানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সারা বছর নাকি এই এলাকাটি পর্যটকদের পদভারে মুখর থাকে। আমি অজু করে এই মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ে ইতিহাসের অংশ হওয়ার চেষ্টা করলাম।
সুলতান আহমেদ মসজিদ থেকে বের হয়ে আমরা গেলাম গ্র্যান্ড বাজারে। দূরত্ব খুব বেশি নয়। ৬০টি গলিতে বিস্তৃত এই বাজারে রয়েছে চার হাজার দোকান। এসব দোকানে পাওয়া যায় সুলতানি যুগে ব্যবহৃত আকর্ষণীয় তৈজসপত্র, বিভিন্ন আকৃতি ও নকশার দৃষ্টিনন্দন লাইট, ফুলদানি ও ঝাড়বাতিসহ সব ধরনের পণ্য, যা যে কারও চোখ জুড়াবে। আমি দুটি দোকানে ঢুকে কিছুটা কেনাকাটা করলাম। গ্র্যান্ড বাজার থেকে বের হয়ে আমরা দেখতে গেলাম আয়া সোফিয়া মিউজিয়ামে। কথিত আছে, ৯১৬ সাল পর্যন্ত ভবনটি ছিল একটি ক্যথলিক চার্চ। সুলতান ফাতেহ কর্তৃক কনস্টান্টিনাপোল বিজয়ের পর এই গির্জার ওপর সুউচ্চ মিনার নির্মাণ করে একে পরিণত করা হয় মসজিদে। আবার ১৯৩৪ সালে কামাল আতাতুর্ক এটিকে পরিণত করেন জাদুঘরে। সুলতান আহমদ মসজিদের কাছেই বহু ঐতিহ্য ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এ অপূর্ব নিদর্শনটি অবস্থিত। আয়া সুফিয়া মিউজিয়ামে সুলতান আমলের অনেক নিদর্শন রয়েছে। বাইরে থেকে এক ঝলক দেখে নিলাম সুলতান সোলেমানের বাসভবন। এক সময় সুলতান পরিবার পরিজন নিয়ে এই ভবনেই থাকতেন। গাইড মোহাম্মদ সাইদের কাছ থেকে জানলাম এই রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে স্থাপিত সংগ্রহশালায় রয়েছে মহানবী হজরত মোহাম্মদের (স.) দন্ত মোবারক, পায়ের ছাপ এবং হজরত ফাতিমা (রা.) ও হজরত হুসাইনের (রা.) ব্যবহৃত জামা ও বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহৃত সাহাবিদের তরবারি। এই শহরে রয়েছে বেসিলিকা সিস্টার্ন নামে একটি জলাধার, যা এক সময় শহরের নাগরিকদের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করত। পরে সংস্কারের অভাবে বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৮৫ সালে মেট্রোপলিটন সিটি কর্তৃপক্ষ এটি পরিষ্কার করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।

default-image

ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে চার ঘণ্টা কেটে গেছে টের পাইনি। গিন্নি বারবার ঘড়ি দেখাচ্ছেন, আর বিমানবন্দরে ফেরার তাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু আমার ফিরতে ইচ্ছে করছে না। একে তো সারা দিন খাওয়া হয়নি, তার ওপর হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত। ছেলেকে কাঁধে নিয়ে হাঁটা আরও কষ্টকর। তাড়াহুড়োর মধ্যে একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে কিছু খেয়ে নিলাম। এখানে খাবারের দাম কিছুটা চড়া হলেও সব হালাল হওয়ায় ভালো লেগেছে। খাওয়া শেষে দেখতে গেলাম বসফরাজ ব্রিজ। ইস্তাম্বুলে গিয়ে এই ব্রিজ না দেখে কোনো উপায় নেই। এটি এশিয়া ও ইউরোপ দুই মহাদেশকে সংযুক্ত করেছে। ব্রিজের নিচে রয়েছে ক্রুজ লাইন। সেখানে দেখলাম ছোটবড় বিভিন্ন আকৃতির পানসি নৌকা, যেগুলোয় করে বসফরাজ প্রণালি ঘুরে দেখেন পর্যটকেরা। সময়ের অভাবে অবশ্য ক্রুজ লাইনে চড়ার সুযোগ হয়নি আমাদের।
ইস্তাবুলই পৃথিবীর একমাত্র শহর, যা দুটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত। ইস্তাম্বুলের আদি নাম ছিল কনস্টান্টিনাপোল। এই ইস্তাবুলই এখন গোটা তুরস্কের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সারা দেশের মোট করের ৪০ শতাংশ জোগান দেয় ইস্তাম্বুল। মোট আয়তন ৫৪৬১ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। এর ৯৮ শতাংশই মুসলমান। ইস্তাম্বুল তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত একটি প্রদেশ। মূল শহরটিকে দু ভাগে ভাগ করে ঠিক মধ্যখান বরাবর বয়ে গেছে বসফরাস নদী। উত্তরে কৃষ্ণ সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর।

default-image

শহরটির পশ্চিম অংশে এশিয়া মহাদেশ, আর পূর্বে ইউরোপ। এক সময় ইস্তাম্বুলই ছিল তুরস্কের রাজধানী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই নগরী শত্রু দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে রাজধানীকে এখান থেকে স্থানান্তরিত করে আঙ্কারায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের আলোয় ইস্তাম্বুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে এক সময় ফিরে এলাম ইস্তাম্বুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এখান থেকে রাত ২টায় ফ্লাই করব ভিন্ন আরেক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ইস্তাম্বুল দেখে মনে হলো কয়েক দিন ঘুরলেও এই দেখা শেষ হওয়ার নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0