default-image

‘এভরি টাউন ফর গান সেফটি’ গত ০৬ নভেম্বর আয়োজন করেছিল ‘ভোট ফর গান সেফটি’। তাঁদের স্লোগান ছিল, ‘আর কত শিশুকে বন্দুকের গুলির শিকার হতে হবে, একটিও নয়’। পাঠক নন্দিত গুরুত্বপূর্ণ পাক্ষিক পত্রিকা ‘নিউ ইয়র্ক’ ২৯ অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর ২০১৮ সংখ্যায় এই উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘দি ক্লাস অব ১৯৪৬-২০১৮’ প্রতিবেদনটি রচনা করেন মাইকেল এভেডন। এই বিশেষ প্রতিবেদনের মূল নিবন্ধে মাইকেল এভেডন উল্লেখ করেন বন্দুকের গুলিকে ‘না’ ভোট দেওয়ার এই বছরটিতে ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডে সহপাঠীর হাতে সতেরো বছর বয়স্ক ছাত্র এবং টেক্সাসে অপর একজন ছাত্র খুন হওয়া ছাড়াও আরও ৭৫ টি স্কুলে শুটিংয়ের ঘটনা খবরের শিরোনাম হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে মন্তব্য করেন, আমেরিকার জনমানুষের স্মৃতিশক্তি বড় দুর্বল। তাঁরা এসব মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা বিস্মৃত হয়ে যান সহজেই, অল্পদিনেই। সারা বছর জুড়ে পর্যায়ক্রমে এগুলোর বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার থাকে না এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় না।
প্রথম নথিভুক্ত স্কুল শুটিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৪০ সালে। আমরা যদি স্কুল শুটিংয়ের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখি, ১৮৪০ সালের ১২ নভেম্বর ভার্জিনিয়া স্টেটের শার্লটস্ ভিলে ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইনের অধ্যাপক জন অ্যান্থনি গার্ডেনারকে গুলিবিদ্ধ করে মারাত্মকভাবে আহত করে ছাত্র জোসেফ সেমেস। আহত হওয়ার তিন দিন পর অধ্যাপক ডেভিস মৃত্যুবরণ করেন।
১৮৫৩ সালের ২ নভেম্বর কেনটাকির লুইসভিলে বড় ভাইকে স্কুলে শাস্তি দেওয়ার কারণে ক্ষিপ্ত ছোট ভাই পরদিন শিক্ষককে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করে।
১৮৫৬ সালে আলাবামা স্টেটের ফ্লোরেন্সে প্রতিশোধপরায়ণতার এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেটি অন্য ঘটনা থেকে একেবারেই আলাদা। স্কুলশিক্ষক ছাত্রদের ভয় দেখিয়ে বলেন যে, তাঁর তোতা পাখিকে যন্ত্রণা দিলে বা উপদ্রব করলে তিনি তাঁকে মেরে ফেলবেন।
কি অবলীলায় এই ঘটনাটি ঘটে যায়! শিক্ষকের ওই রকম হুমকি শুনে এক ক্ষিপ্ত ছাত্র পাখিটির ওপর চড়াও হয় এবং পাখিটিকে মেরে ফেলে। ক্লাস শেষে শিক্ষক ওই ছাত্রকে প্রাইভেট রুমে ডেকে নিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলে। ছেলেটির বাবা জানতে পেরে স্কুলে গিয়ে ওই শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করে।
কত সব সামান্য কারণে এই সব নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ঘটনাগুলি পর্যায়ক্রমে ঘটেই চলেছে। আগে যা ছিল কয়েক বছর পর পর ঘটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ঘনত্ব বেড়েছে। বেড়েছে হতাহতের সংখ্যা। উনিশ শতকের একেবারে শেষভাগ ১৮৯১ সালের ৩০ মার্চ মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের লিবার্টিতে পারসন হিল স্কুল হাউসে স্কুল এক্সিবিশন চলাকালে একজন অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীর গুলিতে সাদা-কালো দুই বর্ণের ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকগণের মধ্য থেকে ১৪ জন মারাত্মকভাবে আহত হন।
এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয় ছাত্র বিক্ষোভ সৃষ্ট ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা। ৭৯ বছর পর পুনরায় মিসিসিপি স্টেটের জ্যাকসনে সংঘটিত হয় জ্যাকসন স্টেট শুটিং। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে দুজন ছাত্র নিহত ও ১২ জন আহত হয়।
ঘটনাটি ঘটে কেন্ট স্টেট শুটিংয়ের মাত্র ১১ দিন পর। ওহাইয়ো কেন্ট স্টেট শুটিংয়ের ওই ঘটনায় ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির চারজন ছাত্রকে মেরে ফেলে। এই ঘটনাটিই প্রথম রাষ্ট্র ও সরকারকে ব্যাপক সচকিত করে তোলে। স্মরণকালে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি কলম্বিয়ান হাই স্কুল ম্যাসাকার নামে পরিচিত। ১৮ বছর বয়স্ক এরিক হ্যারিস ও ১৭ বছরের ডাইলান ক্লিবোল্ড, স্কুলের ১২ জন ছাত্র ও শিক্ষককে হত্যা ও ২১ জনকে আহত করে। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আততায়ী দুজন লাইব্রেরি কক্ষে আত্মহত্যা করে।
স্কুল শুটিং থেমে নেই। ক্ষমতার রাজনীতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন,সামাজিক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে চলেছে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছিনতাই, চুরি, খুন, ধর্ষণ, সিরিয়াল কিলিং। স্কুল গান শুটিংও থেমে নেই। ঘটনা ঘটছে, পত্র-পত্রিকায় খবর হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিবাদ হচ্ছে। ঘটে যাওয়া নতুন ঘটনার তোড়ে পুরোনো ভেসে যাচ্ছে। মানুষ ভুলে যাচ্ছে।
এইবার প্রথম গণমানুষ অনেকটা সচেতন, সজাগ। তাঁরা খোলা বাজারে ফায়ার আর্মস বিক্রয় ও ব্যাপকভাবে আত্মরক্ষার নামে নিজের অধিকারে আর্মস রাখার বিরুদ্ধে না বলেছেন। একজন মানুষকেও তাঁরা এভাবে অপঘাতে মরতে দেখতে চান না। সে জন্যেই ৬ নভেম্বরের এই ভোটের আয়োজন।
কিন্তু নিউইয়র্ক পত্রিকায় মাইকেল এভেডনের নিবন্ধের উদ্দেশ্য ও বিষয় আলাদা। তিনি নিহতদের জন্য অবশ্যই সমব্যথী, তবে তিনি বলতে চেয়েছেন ওই সব ঘটনার ভিকটিম, যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় বেঁচে মর্মান্তিক কষ্টকর জীবন যাপনের দুঃখ সয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদের কথা। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ওই সব ঘটনার শিকার হয়েও জীবনের দিকে ফিরে আসা কয়েকজন মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁদের বর্তমান জীবন যাপনের অসহায়ত্ব তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছেন জেয়ার্ড সোউল ও অ্যামেলিয়া স্খনবেক। সাক্ষাৎকারগুলো থেকে মাত্র ক’টি ঘটনা, ক’জনের কিছু অংশ তুলে ধরে আমরা বুঝতে পারি বেঁচে থাকা কী মর্মান্তিক! অনুধাবন করতে পারি তাদের ও তাদের পরিবারের মানুষগুলোর মনোবেদনা!
অ্যান্থনি বোরজেস মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে (পার্কল্যান্ড, ফ্লোরিডা) ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে ( কী আশ্চর্য, দিনটি ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে সাড়ম্বরে বিশ্বময় পালিত হয়) স্কুল শুটিংয়ের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় পনেরো বছর বয়সে। এই ঘটনায় নিহত হয় ১৭ জন এবং আহতের সংখ্যা ১৭। অ্যান্থনি দুই মাস হাসপাতালে ছিল। পিঠে গুলিবিদ্ধ হওয়ার একটা বড় ছিদ্র, কাটা-ছোঁড়া দাগ নিয়ে আজও সে বেঁচে আছে। দাঁড়াতে গেলে তার শ্বাস কষ্ট হয়। সে দৌড়াত চায়, পারে না। সে এখন হোম স্কুলিংয়ের আন্ডারে। মনমরা থাকে সারাক্ষণ, অনিরাপদ ভাবে নিজেকে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সাল ক্যাস্ট্রো মিডল্ স্কুলের ছাত্রী আশরাহ্ ফেলিক্স ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তেরো বছর বয়সে তার সহপাঠী বান্ধবীর সঙ্গে করে নিয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে আহত হয়। ওই দিনের ঘটনায় দুইজন আহত হয়। আশরার কবজি গুলিবিদ্ধ হয়। সেই আঘাত, তার যন্ত্রণা নিয়েই কাটাতে হবে তার বাকি জীবন।
২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল ক্যালিফোর্নিয়ার সান বারনারডিনোতে নর্থ পার্ক এলিমেন্টারি স্কুলে শুটিংয়ের ঘটনায় মারা যায় তিনজন এবং মারাত্মকভাবে আহত হয় মাত্র নয় বছরের বালক নোলান ব্রান্ডি। গুলি তার দুটো রিভ ভেঙে দিয়ে, লাঙ ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়েছে।
অলৌকিক ভাবে সে বেঁচে গেছে ও বেঁচে আছে। খানিকটা সুস্থ হওয়ার পর সে স্কুলের বন্ধুদেরকে খুব মিস করায় মা তাকে স্কুলে নিয়ে যায়। কিন্তু ভয়ে সে স্কুলে প্রবেশ করতে পারেনি। আনন্দের কথা সে এখন স্কুলে ফিরেছে।
স্কুল ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়ে উল্লাস করলে নিক ওয়াল্কজাক কোনো কারণ ছাড়াই শৈশব থেকে পরিচিত টি জে ফায়ার আর্মস বের করে গুলি করে। ঘটনাটি ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, ওহাইও স্টেটের চারডন হাই স্কুলে। ওয়াল্কজাক বয়স তখন ১৭ বছর। একটি ২২ ক্যালিবারের সেমি অটোমেটিক হ্যান্ডগান দিয়ে সম্ভবত তাকে তিনবার গুলি করা হয়েছিল, যা তার সামনের জীবনটাকে হুইল চেয়ারের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে।
স্কুলে একই ব্যান্ডে থাকা অতি পরিচিত এবং তাকে সে পছন্দও করত, এ রকম একজন কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ফুসফুস ও মেরুদণ্ডের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে সারা জীবনের জন্য হুইলচেয়ারবন্দি হয়েছেন, কেনটাকির ওয়েস্ট পাডুকাহর হেল্প হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী মিসি জেনকিন্স স্মিথ। মাত্র পনেরো বছর বয়সে ঘটনাটি ঘটেছে। উক্ত ঘটনায় ৩ জন মারা যায় ও ৫ জন মারাত্মক আহত হয়।
‘ব্রুকলিন হই স্কুল ফর অটোমোটিভ ট্রেডস’ ব্রুকলিন, নিউইয়র্কে ১৯৪৮ সালের ২৫ জুন মাত্র ৩৫ সেন্টের জন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে ৭২ বছর ধরে দুঃসহ যন্ত্রণার স্মৃতি বহন করে চলেছেন ভিক্টর সিমন। তখন তাঁর বয়স পনেরো বছর। স্কুলের লাঞ্চ রুমে তিনি তাঁর কাছে লাঞ্চ ও সাবওয়ে ভাড়া বাবদ থাকা ৩৫ সেন্ট বের করলে ৪/৫ জনের একটি দল তা দেখে ফেলে। তাদের একজন কত আছে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোয়ার্টারটি তুলে নিয়ে গুলি করে চলে যায়।
২০১৮ পর্যন্ত স্কুল শুটিংয়ের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র, তার ভয়াবহতা, বেঁচে ফিরে আসা মানুষের মধ্যে ক’জনের জীবনের বেদনাবহ ছবি দেখে ও জেনে আমরা ভয়াবহ এই ব্যাধির ধ্বংসাত্মক সর্বগ্রাসী রূপ দেখতে পাই যা সমাজ দেহটাকে ক্ষতাক্ত, পঙ্গু করে তুলছে। এ শুধু স্কুলে ঘটছে, তা নয়। আমেরিকায় ঘটছে শুধু, তাও নয়। বিশ্বব্যাপী মানব সমাজকে এর থাবাক্রান্ত করে রেখেছে। পৃথিবী নামের মানুষের গ্রহটাকে ক্রমশ আবাস অযোগ্য করে তুলছে।
দায়ী কারা? যারা ঘটাচ্ছে, তারা কেমন? তাদের হাতে অস্ত্র আসছে কীভাবে? আগ্নেয়াস্ত্র এত সহজপ্রাপ্য হয় কী করে? অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কি দায়ী? রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন কি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বাধ্য হন?
দায়ী কি পিতা-মাতা? সন্তান সম্পর্কে তাঁদের দায়িত্বের প্রতি ঔদাসীন্য? দায়ী কি স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষাদান ব্যবস্থা?
নাকি এর সবগুলো? ওরা কি ভয়াবহ একাকিত্ব ও অমনোযোগের শিকার হয়ে বিকারগ্রস্ত? ওদের কি সময়মতো প্রফেশনাল কাউন্সেলিং প্রয়োজন ছিল?
আবার যারা ওই সব ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে অথবা মারাত্মক আহত হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে জীবনের দিকে ফিরে এসে পঙ্গু মানুষের জীবন, অথবা অসহায় জীবন যাপন করে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের কী দোষ ছিল? অকালে অসময়ে কেন তাদের সম্ভাবনাময় জীবন এভাবে থেমে গেল? তারা তো আলো ছড়িয়ে তাদের বাবা-মার কোল আলো করে পৃথিবীতে এসেছিল? তাদের হাসি থেমে গেল কেন এমন করে?
কি মর্মান্তিক এই বেঁচে থাকা, যা মরে যাওয়ার চেয়েও কষ্টের, যন্ত্রণার! তার নিজের জন্য, তার পরিবারের জন্য।
সমাজদেহের এই দুরারোগ্য ক্ষত সারাতে এখনই আমাদের সম্মিলিত বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে সোচ্চার করতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্রকে অবশ্যই জোরালো কণ্ঠে বলতে হবে “না”।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0