বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
করিম গান ছাড়তে পারেননি, তবে একতারা হাতে ছেড়েছিলেন আপনজন ও নিজ গ্রাম। এলাকা ছাড়লেও তাঁর ঠিকানা হয় লাখো ভক্তের হৃদয়ে। এক সময় সংসারও বেধে রাখতে পারেনি তাঁর বৈরাগ্য মনকে। সংগীতের প্রতি একাগ্রতা, সত্যের পথে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস তাঁকে সাহসী করে তুলেছিল। তাই পার্থিব ও অপার্থিব সংকীর্ণ স্বার্থের সম্পূর্ণ বাইরে রেখেছেন নিজেকে।

মরমি ধারার আধুনিক কবি শাহ আবদুল করিম গানের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের হৃদয় যেমন স্পর্শ করেছেন, তেমনি কাঁদাতে পেরেছেন ভক্তকুলকে। গভীর চেতনা থেকে উঠে আসা অধ্যাত্মপোলব্ধির প্রজ্ঞাময় নির্যাস থেকে তুলে আনা গানগুলো প্রাণের খোঁড়াক জোগায়। তাঁর ভক্তের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম, ছোট-বড় নেই, সবাই যেন একই সত্তা। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্দীপ্ত, প্রগতিশীল এবং দেশপ্রেমিক করিম অন্তরে লালন করেছেন মরমি দর্শন।

নিবিড় অনুরাগ ছিল স্রষ্টার প্রতি। তাঁর উপাসনার ক্ষেত্র ছিল সমগ্র সৃষ্টিলোকে। শাস্ত্রের চেয়ে আত্মপ্রত্যয়ে জোর দিয়েছেন বলেই তাঁর দর্শন ও রচনায় হিন্দুর রাধাকৃষ্ণ, মুসলমানের আশেক-মাশুক মিলেমিশে একাকার হয়েছে। প্রকৃত অর্থে তিনি ‘বাউল’ না হলেও অতি সচেতন ও বিচক্ষণতায় নিজের মধ্যে ‘বাউল’ সত্তাকে লালন করেছেন যত্ন সহকারে।

তিনি রূপকের আশ্রয়ে সন্ধান করেছেন পরম সত্তাকে। দেহের সীমায় অসীমকে খুঁজে পেয়ে হয়েছেন আত্মহারা। মহানের কাছে করেছেন আত্মসমর্পণ, পরমের মধ্যে বিলীন হওয়ার চির-কামনায় করেছেন আর্তনাদ—

‘আমি কি করিবো রে প্রাণনাথ

তুমি বিনে

আমার সোনার অঙ্গ পুড়ে অঙ্গার

হল দিনে-দিনে রে প্রাণনাথ

তুমি বিনে’

অতীন্দ্রিয়লোকে বিরাজমান ঈশ্বরের সঙ্গে লীন হওয়ার অতৃপ্ত বাসনায় বিলাপ করেছেন কখনো কখনো। তাঁর চিন্তা-চেতনা শুধু বাউল কেন্দ্রিক ছিল না। দর্শন ও ভাবনার গতিপথের বাঁক ছিল বিভিন্ন দিকে। স্বশিক্ষিত হয়েও পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন তাঁর রচনায় মানবতার অমূল্য নিদর্শন রেখে। একতারা হাতে ধ্যানমগ্ন করিম আর মঞ্চে ওঠা প্রতিবাদী করিম যেন একই দেহে ভিন্ন দুই রূপ। ন্যায়, ক্ষমতা ও অধিকার আদায়ে অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করে মাটি-মানুষের দুঃখ-বেদনার আর্তিগুলো পরম মমতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর গানে ভাটি বাংলার ভৌগোলিক মানচিত্রসহ রয়েছে সিলেটের সম্পদ ও রূপের বর্ণনা। শব্দ চয়নে নৈপুণ্য ও পারদর্শিতা যেমন দেখিয়েছেন তেমনি প্রকরণ এবং বিন্যাসে রয়েছে নিজস্ব ধারা।

মুর্শিদের করুণা প্রার্থনা এবং অনন্তকালের প্রিয়া বিরহে যেন অন্তহীন বেদনার করুন বাঁশি বাজে তাঁর প্রাণে। আল্লাহ, নবী, পির-মুর্শিদসহ দেহতত্ত্বের প্রতীকী প্রকাশ এবং নিগূঢ় তত্ত্বের আলো-আঁধারের বিচ্ছেদের আর্তনাদ ছিল করিমের আরাধ্য সাধনার পথ। তাই তো দেহতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্বের অসংখ্য গান রচনা করেছেন বিভিন্ন রূপকে-উপমায় সজ্জিত করে। জাগতিক এবং অধ্যাত্মবাদের গভীর আর্তিগুলো তিনি প্রকাশ করেছেন সহজ ভাষায়, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

মাত্র আট দিন পাঠশালায় যাওয়া সহজ জীবনের, সহজ মানুষ ছিলেন শাহ আবদুল করিম। হাওরের কাদাজল অঙ্গে মেখে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন আজীবন। কখনো দিন কেটেছে কেবল পানি খেয়ে। শোক, তাপ, জ্বালা, যন্ত্রণা পোহানো এক কিশোরের হৃদয়ের আর্তনাদ বাঁশির সুরে ভেসে বেড়িয়েছে মুক্ত আকাশে। দারিদ্র্যকে বরণ করাই ছিল মোহহীন করিমের অহংকার। একতারা হাতে নেমেছেন অচিন পথের সন্ধানে, খুঁজে বেড়িয়েছেন মনের মানুষকে। বিনা চিকিৎসায় স্ত্রী মারা গেলেও তিনি অবিচল থেকেছেন ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কর্মে। যতবারই আঘাত পেয়েছেন, ততবারই দৃঢ় প্রত্যয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন সত্য ও ন্যায়ের পথে। শোষণ ও অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র অঙ্কন করেছেন নিপুণ দক্ষতায়। বাদ পড়েনি ব্যক্তিগত যাপনচিত্র।

দুঃখ-দারিদ্র্য, দ্রোহ, দুর্দিনের মাঝেও তাঁর ভাবমিশ্রিত প্রেম-ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনার অস্তিত্ব জড়ানো গানগুলো নির্মল প্রশান্তি দেয়। তাঁর জীবনের গ্লানিপূর্ণ বেদনার তিক্ত কণ্ঠস্বরই আমাদের কাছে আজ এত মধুর। তাঁর ব্যর্থতার করুণ বিলাপ উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয় প্রতিবাদের রাগিণী হয়ে। জীবন জিজ্ঞাসাকে নিয়ে গেছেন জীবনবোধের যৌক্তিক প্রেক্ষাপটে। আজীবন বলেছেন মানুষের কথা, ভেবেছেন মানুষের অধিকার আদায় নিয়ে। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র। তাঁর একাধিক সত্তায় দৃষ্টিপাত করলে বেড়িয়ে আসে সম্পূর্ণ এক মানবতার কবি, সমাজ সচেতন গণমানুষের কবি ও একজন দার্শনিকের ছবি। এই মহাপুরুষকে কি কেবল ‘বাউল’ আখ্যা দিয়ে বাউলের চাদরে ঢেকে রাখা যায়?

করিমের গানে দার্শনিকতার গভীরতা এবং তত্ত্বকথার জটিলতা না থাকলেও কৌশলে একেবারে সহজ-সরল ও সাবলীল ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন দর্শনচেতনা। কঠিন কথাগুলোকে এত সহজ করে বলার দক্ষতা কত জনের হয়? এই সহজ কথাগুলোই যেন সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে ভক্তের হৃদয় তীরে। অধ্যাত্মচেতনায় যেমন গানের বাণীতে করেছেন গভীর সমর্পণ তেমনি ক্ষীণ চেহারায়, ক্ষুধার্ত বদনে, উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের কথা। কে জানত! হাওরের এক রাখাল বালকই পৃথিবীর সংগীত প্রিয় মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবে মানবতার বাণী! সরলতা এবং উদারতায় নিজের সত্তা বিলিয়ে দেওয়া করিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করেননি। তবে শিখেছেন মানব জীবনের বাস্তব মঞ্চ থেকে, সামাজিক নির্মমতা থেকে, প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে। কিন্তু তাঁর মতো উদাত্ত কণ্ঠে আমরা বলতে পারি না বলেই হয়তো দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আজ ঘুণ ধরেছে, উইপোকায় কাটছে আমাদের মানবতাকে।

করিম গান ছাড়তে পারেননি, তবে একতারা হাতে ছেড়েছিলেন আপনজন ও নিজ গ্রাম। এলাকা ছাড়লেও তাঁর ঠিকানা হয় লাখো ভক্তের হৃদয়ে। এক সময় সংসারও বেধে রাখতে পারেনি তাঁর বৈরাগ্য মনকে। সংগীতের প্রতি একাগ্রতা, সত্যের পথে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস তাঁকে সাহসী করে তুলেছিল। তাই পার্থিব ও অপার্থিব সংকীর্ণ স্বার্থের সম্পূর্ণ বাইরে রেখেছেন নিজেকে। সুগভীর তত্ত্বজ্ঞানে নিজেকে সমৃদ্ধ করলেন গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে। গান ছাড়া তো প্রাণ বাঁচে না, তাই দমে দমে তাঁর সুর বাজতে থাকে—‘গান আমার জপমালা গানে খোলে প্রেমের তালা/প্রাণবন্ধু চিকন কালা অন্তরে দেয় ইশারা’।

হ্যাঁ, প্রাণবন্ধুর ইশারাতেই দিনে দিনে তাঁর মানবগাড়ির চাকা, ইঞ্জিন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কালার চিরপ্রস্থানের ডাকে সাড়া দিলেন তিনি। নিভে গেল তাঁর দেহগাড়ির হেডলাইট। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বের সব একতারা, দোতারা, বেহালা, বাঁশি যেন একসঙ্গে বেজে উঠেছিল বিরহের সুরে—

‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু

ছেড়ে যাইবায় যদি...’।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন