default-image

ডেমরার কোনাপাড়ায় ৯ জানুয়ারি হজরত শাহজালাল সড়কে একটি ফ্ল্যাট থেকে সাড়ে চার বছর বয়সী নুসরাত জাহান ও পাঁচ বছর বয়সী ফারিয়া আক্তার দোলার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে জানা যায় ইয়াবা আসক্ত দুই যুবক গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল বাওয়ানী লিপস্টিক দেওয়ার কথা বলে শিশু দুটিকে ফ্ল্যাটে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিশু দুটিকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে।
উল্লেখিত ঘটনাটি বিভিন্ন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর থেকেই ভাবছিলাম, এবার কিছু না বলি। বলে-বলে, লিখে-লিখে এখন বিরক্তি এসে গেছে। কারও কিছু যাচ্ছে-আসছে না। ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্র এমন একটা ভাব নিয়ে আছে, যেন রোজ ১০/১২টা ধর্ষণ না হলে ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূখণ্ডটি তার ‘পৌরুষ’ হারাবে!
আসলে আমাদের অনুভূতি দিন দিন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। আমরা রোজ এত ধর্ষণ, এত মৃত্যু, এত পৈশাচিক মানুষের গল্প শুনি যে, এখন আর সেগুলো আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয় না।
অভ্যস্ততার একটা ব্যাপার তো আছে! মা ও তিন কন্যাকে ঘরের মধ্যে আটকে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার গল্পে আমরা অভ্যস্ত। আমরা অভ্যস্ত শিশুর পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার গল্পে। আমরা শুনে অভ্যস্ত পূজার মতো পাঁচ বছর বয়সী শিশুর যোনিপথে ব্লেড চালানোর গল্পে। আমরা শুনে অভ্যস্ত তানহার মতো চার বছর বয়সী শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার গল্পে। আমরা অভ্যস্ত রামপুরায় বাড়িতে ১২ বছরের শিশুকে চার দিন আটকে রেখে গণধর্ষণের গল্পে। আমরা অভ্যস্ত আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের ইন্দইল গ্রামে ১৩ বছরের মূক ও বধির প্রতিবন্ধী মেয়েটির নির্মম ধর্ষণের বর্ণনায়। পুলিশ সদস্যদের ইয়াসমিনকে ধর্ষণ, শরিয়তপুরের নড়িয়ার চামটা গ্রামের ১৫ বছরের হেনার ধর্ষণ, অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী পূর্ণিমা রানী শীলের গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর ছবি রাণীর যৌনাঙ্গে কাচের টুকরো, মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়ার গল্পে আমরা নির্বিকার। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজপালং ইউনিয়নের হরিণমারা বাগানের পাহাড়ি এলাকার ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী সাবেকুন্নাহারের নিজের বাবা নূরুল আলম দ্বারা বর্বর ধর্ষণ, বগুড়ার কলেজ ছাত্রীকে ক্ষমতার দাপটে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ শেষে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া, রাজধানীর জুরাইনে স্কুল কক্ষে আটকে রেখে ১১ বছরের একটি মেয়েকে আটজন ‘পুরুষ’ মিলে রাতভর ধর্ষণের গল্পে আমাদের সংবিৎ ফেরে না। এই যখন আমাদের অভ্যস্ততা, এই যখন আমাদের চেতনা তখন ভাবি, দুটি শিশুর ধর্ষণের গল্পে ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের বিবেক কতখানি নড়ে উঠবে?
সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে ধর্ষণ। সমাজের সর্বস্তরে চলছে ধর্ষণের প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ আমাদের সংবিধান বলছে, আইনের কাছে সমান আশ্রয় লাভের অধিকার শুধু অধিকারই নয়, এটা আমাদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। মৌলিক অধিকার হচ্ছে এমন এক অধিকার, যা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রদান করতে আইনত বাধ্য। প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করায় হাইকোর্ট তার রায়ে নির্দেশ দিয়েছেন, অভিযুক্ত আসামিদের হয় ফাঁসি দেওয়া হবে, না হলে গুলি করা হবে। শুধু হত্যার চেষ্টায় কঠিন রায় শোনানো হয়েছে। আমাদের দেশে যখন বারান্দায় ঘুমন্ত বেলুন বিক্রেতার চার মাসের শিশুকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়, তখন সে মামলার আসামিদের নানান অজুহাতে খালাস দেওয়া হয়। শিশু ধর্ষণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই পক্ষপাত ও ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
একটি শিশু, সে কেবলই শিশু। যৌনতা বা পাশবিকতা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। সে মাত্র চোখ খুলে পৃথিবীকে দেখতে শিখছে। সে মুহূর্তে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে মেনে নিতে সে অক্ষম। কারণ তখনো শিশুটির মস্তিষ্ক পরিপক্ব হয়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে ভাবি, আমাদের নুসরাত জাহান ও ফারিয়া আক্তার মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। কে বলতে পারে বেঁচে থাকলে তারা আবারও একই নির্যাতনের শিকার হতো না। এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে এমনিতেও তাদের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতো। তারা হয়তো শ্বাস নিত, আদৌ বেঁচে থাকত না। প্রশ্ন থেকে যায়, এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের কতখানি নিকৃষ্টতা ও অধঃপতনের পরিচয় বহন করে?
ধর্ষণ প্রতিরোধে আইন রয়েছে। আইনের কার্যকারিতা নেই। আসামি আটক করা হয়, আবার ছেড়েও দেওয়া হয়। সমাজ-রাষ্ট্রের কাছে আমাদের কিছুই আশা করার নেই। মাঝে মাঝে এক দুটি ঘটনায় আসামির বিচার হয়। কিন্তু সেই বিচার ধর্ষণ দমনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না। অনেকেই ধর্ষকের ফাঁসি চান, ধর্ষকের লিঙ্গ কেটে নিতে চান। তাতেও কি ধর্ষণ কমবে? কমবে না। তাই নিজেদের প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেদেরই নিতে হবে। কিভাবে? আমাদের সেলফ ডিফেন্স করতে হবে। পুরো ব্যবস্থাটি ঢেলে সাজিয়ে রাখতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নৈতিক এবং মানবিক অবক্ষয় অর্থাৎ আত্মিক অধঃপতন থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিপ্লবকে বাস্তবে টেনে এনে এমন একটি বিপ্লবের জন্ম দিতে হবে, যেখানে আমাদের জীবনব্যবস্থায় প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধের গুরুত্ব বেশি থাকবে। ছোট থেকেই নিজেদের ছেলে ও মেয়ে সন্তানদের পর্যাপ্ত আলোচনার মাধ্যমে ধর্ষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাদের সেলফ ডিফেন্স বিষয়ে জ্ঞান দিতে হবে। অন্যকে সম্মান করাটা শেখাতে হবে। নৈতিক অবক্ষয় থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে খুব সচেতনভাবে, যেন তারা ধর্ষণের মতো অপরাধে কখনো না জড়ায়। আর এই কাজটি একটি পরিবার থেকেই কেবল শুরু হতে পারে।
একটা বিষয় ভেবে দুঃখ হয়—আমরা ধর্ষণের প্রতিবাদ করি, মানববন্ধন হয়, পুলিশি তৎপরতায় আসামি গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তারপর? ক্ষমতা ও টাকার জোরে অধিকাংশ আসামি পার পেয়ে যায়। আজ যারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন, যারা খবর ছেপেই দায়িত্ব শেষ করছেন, যারা নীরব দর্শক হয়ে শুধু শুনেই যাচ্ছেন, যারা আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষক হচ্ছেন, তাদের বলব—জেগে উঠুন। আপনাদের বলার অনেক কিছু আছে। আপনাদের করার অনেক কিছু রয়েছে। প্রতিবাদ করতে নিয়ম নীতি লাগে না। প্রতিবাদ করতে তুখোড় সাহিত্যিক হতে হয় না। প্রতিবাদ করতে জনপ্রিয় ব্লগার হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আপনারা লক্ষ-কোটি জনতা কেবল চুপ করে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে, প্রতিবাদ করুন। প্রকাশ্যে, জনপথে, কর্মক্ষেত্রে, বাসস্থলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সর্বক্ষেত্রে আপনারা প্রতিবাদ করুন। আপনাদের নীরবতা ধর্ষকদের জন্য প্লাস পয়েন্ট, অপরাধ বৃদ্ধির সুযোগ! আজ ভিকটিম নুসরাত-ফারিয়া। পার্শ্ববর্তী এলাকার কেউ। আজ ভিকটিম প্রতিবেশী। কাল সে ভিকটিম হতে পারে আপনার প্রিয় কেউ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0