কামালাকে নিয়ে বাংলাদেশি নারীরা যা ভাবছেন

বিজ্ঞাপন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন তাঁর রানিং মেট হিসেবে একজন ‘আফ্রিকান আমেরিকান’ বা ‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান’ বংশোদ্ভূত নারী কামালা হ্যারিসকে বেছে নিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার এই কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটর জয়ী হলে আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কোনো  কৃষ্ণাঙ্গ নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন, গড়বেন ইতিহাস।

আগামী সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কনভেনশনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন–কামালাকে অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র দুজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে লড়েছেন। ২০০৮ সালে রিপাবলিকান পার্টির হয়ে সারা পলিন, ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে জেরালডিন ফেরারো। তবে তারা কেউই নির্বাচিত হতে পারেননি।

অভিবাসী ভারতীয় শ্যামলা হ্যারিস ও জ্যামাইকান ডোনাল্ড হ্যারিসের সন্তান ৫৫ বছর বয়সী কামালা। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত সিনেটর কামালা রাজনীতিতে আসার আগে আইনজীবী হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেন। তিনি সান ফ্রান্সেসকো জেলা অ্যাটর্নি ও ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মধ্য বামপন্থী হিসেবে রাজনীতিতে পরিচিত কামালাকে ডেমোক্রেটিক পার্টির উদার ও প্রাচীনপন্থীদের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুখোড় বিতার্কিক কমলা নারী অধিকারের পক্ষে ও বর্ণবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছেন।

নিউইয়র্কবাসী বরাবরই ডেমোক্র্যাট সমর্থক। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছিল সেই কামালা হ্যারিস, সুজান রাইস, গ্রিচেন হুইটমার, টামি ডাকওয়ার্থ, ক্যারেন বাসের জনপ্রিয়তা নিয়ে নিউইয়র্কবাসীর মতভেদ থাকতেই পারে। এদের কীভাবে দেখছেন নিউইয়র্কে বসবাসর বাংলাদেশি আমেরিকান নারীরা। কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার।

লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট লিজি রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচনে সিনেটর কামালা হ‍্যারিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত হওয়া যুগান্তকারী ঘটনা। আমেরিকার প্রায় আড়াই শ বছরের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী প্রেসিডেন্ট বা ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। আফ্রিকান আমেরিকান বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান তো নয়–ই। কে কবে ভেবেছিল, এক পুরুষেই আমাদের ছেলেমেয়েরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারবে! কারণ বাইডেন নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এক মেয়াদ প্রেসিডেন্ট থাকবেন। তারপর হয় তো কামালা হ‍্যারিসই হবেন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। সব দিক দিয়েই তাঁকে বাছাই করে বাইডেন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

গবেষক বিলকিস রহমান বলছেন, ‘ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন তাঁর রানিং মেট হিসেবে কামালা হ্যারিসকে নির্বাচিত করায় আমি ভীষণ আনন্দিত। শুধু নারী বা দক্ষিণ এশীয় বলে নয়, বরং একজন যোগ্য, স্পষ্টবাদী, তরুণ, অভিজ্ঞ, তীক্ষ্ণ যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে তাঁকে আমার ভীষণ পছন্দ। ট্রাম্পের মতো যারা নারীদের নিচু শ্রেণির প্রাণী হিসেবে দেখেন, তাদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য আমি কামালাকে সমর্থন করি।

অবশ্য আমেরিকানরা এখনো এ রকম আত্মবিশ্বাসী নারীকে মেনে নিতে প্রস্তুত কিনা, সন্দেহ আছে!  তারপরও আশায় বাঁচি!

লেখক রাজিয়া নাজমী অবশ্য বলছিলেন, সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রানিং মেট হিসেবে কামালা হ্যারিসের কাছেই ফিরে গেলেন জো বাইডেন। বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্য যে দেশে এত প্রকট, সেখানে সাম্প্রতিক ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনকে ভরসা করে এই ঝুঁকি নিলেন বাইডেন। জন ম্যাককেইনের হেরে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিলেন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সারা পালিন। তবে এটি ঠিক, হিলারি ‘নারীর’ রাস্তা অনেকটাই প্রশস্ত করে দিয়েছেন। তারপরও কামালা কৃষ্ণাঙ্গ নারী। এবার এত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এতটা ঝুঁকির দরকার ছিল কি?

নাজমী বলেন, ‘আমার চাওয়া যেকোনো উপায়ে ট্রাম্পমুক্ত দেশ। তাঁর  মতো একজন বর্ণবাদীকে সরানোর জন্য আমেরিকানরা একজন নারীকে যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেয়, সেটাই হবে একটি মাইলফলক।’

লেখক ও সাংবাদিক মনিজা রহমানের মতে, কামালাকে রানিং মেট করে বাইডেন এক ঢিলে তিন পাখি মেরেছেন। নারী, কৃষ্ণাঙ্গ ও দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের পাশে পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছেন তিনি। অবশ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আমার ব্যক্তিগত পছন্দের প্রার্থী ছিলেন এলিজাবেথ ওয়ারেন, তাঁর প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের কারণে। তাঁকে অবশ্য বার্নি স্যান্ডার্স শিবিরের লোক মনে করা হয়। আরেকটা কথা না বললেই নয়, ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নারী হয়েছেন—এ জন্য আমি খুব উচ্ছ্বসিত নই। কারণ এটিকে আমার কাছে মনে হয় পুরুষতান্ত্রিকতার ছায়ায় নারীর শক্তিকে ব্যবহার করা। যেদিন কোনো নারী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, সেদিনই আমি সত্যিকারের আনন্দিত হব।

আরেক লেখক ও সাংবাদিক রোকেয়া দীপা বলছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় মিশ্রণের কোনো নারীর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে পদপ্রার্থী হওয়া নিঃসন্দেহে আমেরিকার রাজনীতিতে ইতিহাস। আমি নিজেও একজন এশিয়ান আমেরিকান। আমেরিকার সঙ্গে এশীয়দের জন্যও কামালা ভালো কিছু করবেন—এমন প্রত্যাশায় থাকব।

লেখক ভায়লা সালিনার ভাষায়, ‘আমি সত্যিই খুব আনন্দিত যে আমেরিকার অবিবেচক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অগত্যা বিদায় নিতেই হচ্ছে। কামালাকে অভিনন্দন। আমি বলব, নতুনের আগমনে পরিবর্তন আসতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী কামালা হয়তো সচেতন থাকবেন নিজ পদে।’

বাংলাদেশি আমেরিকান লেখক ও সাংবাদিক রওশন হক মনে করেন, ‘কামালা ভোটে জিতে এশীয়দের জন্য আলাদা কিছু করবেন মনে করলে ভুল হবে। ব্ল্যাক আমেরিকানদের জন্য হট ফেবারিট বারাক ওবামাও উল্লেখযোগ্য কিছু করে যাননি। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছে কৃষ্ণাঙ্গরা। সেই কৃষ্ণাঙ্গ ভোটকে টার্গেট করেই কামালাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করেছে ডেমোক্র্যাটরা। তাঁকে আফ্রিকান আমেরিকানদের ভোটব্যংক হিসেবে নির্বাচনী রাজনীতির ঢাল বানানো হয়েছে। তবে যেই জিতুক, আগামী পৃথিবীতে আমেরিকা যেন অন্য কোনো দেশের ক্ষতি না করে, সে আশাই করতে চাই।’

লেখক ও শিক্ষক এইচ বি রিতা বলছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গরা। এ মুহূর্তে একজন ‘কৃষ্ণাঙ্গ নারী’কে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা মানে বাইডেনের ঝুড়িতে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট আসা। যদিও কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় সাদা আমেরিকানদের ভোটই বেশি। তবে, আমেরিকার একজন আইনজীবী ও ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর হিসেবে কামালা যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। আশা করব, শুধু এশীয় বা কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নয়, ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে তিনি দেশের জন্য সেবা দেবেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন