default-image

করোনাভাইরাস মহামারি আকার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এতে থমকে গেছে সারা বিশ্ব। বন্ধ হয়ে গেছে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের যোগাযোগ। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বিপদে পড়েছেন এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য মানুষ। এমনই একজন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি আমেরিকান ফ্যাশন ডিজাইনার রোজিনা আহমেদ রুনি। তাঁর রুচিশীল ডিজাইনের পোশাক ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান গ্রাহকদের দৃষ্টি কেড়েছে।

করোনার কারণে চলা লকডাউনে ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রুনির ডিজাইন করা পোশাকের একটি ভালো স্টক ছিল, যা করোনায় কারণে বিক্রি হয়নি। করোনার প্রথম ধাক্কাটা লেগেছিল বৈশাখে। সর্বজনীন বাঙালির প্রাণের উৎসবে দেশের মতো এখানেও পয়লা বৈশাখে মানুষ নতুন জামা-কাপড় কেনে। সে জন্য এখানে ছোটবড় ফ্যাশন হাউসগুলো চেষ্টা করে নিত্যনতুন ডিজাইন দিয়ে বাঙালির মন ভরাতে। করোনায় এবার বড় ক্ষতি করেছে এসব ডিজাইনারদের। ডিজাইনারদের সবার বৈশাখের পোশাক তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তখনই লকডাউন শুরু হয়ে যায়।

পরের বড় উৎসব ছিল ঈদুল ফিতর। সেই ঈদেও একই অবস্থা। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি ঈদুল আজহাতেও। ঈদকে সামনে রেখে সারা বছর ওদের যে টার্গেট থাকে, করোনার কারণে তাও ভেস্তে গেছে। সর্বশেষ ঈদুল আজহায় রুনির পোশাক বিক্রি হয়নি বলে চাপে পড়ে যান রুনি। করোনার কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানের পোশাকও অর্ডার পাননি। রুনি ছাড়াও তার প্রতিষ্ঠানে কয়েকজন কাজ করেন। শোরুম বন্ধ থাকায় তারাও বেকার হয়ে পড়েন।

নিউইয়র্কের বাসিন্দা রুনি ১৯৮০-এর দশকে ঢাকার বিআইডি থেকে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর প্রথম কোর্স করেন। তিনি দুবাই ফ্যাশন ডিজাইন থেকে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন যাতে তার পোশাক ডিজাইনের সৃজনশীলতার কাজ লেগেছে। তাঁর ডিজাইন করা পোশাক ক্রেতাদের অনন্য স্বাদটি পেতে সহায়তা করেছে।

চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা রুনি সব সময় স্বপ্ন দেখতেন ফ্যাশন নিয়ে, তিনি বরাবরই ছিলেন ফ্যাশন সচেতন। তার ফ্যাশন ডিজাইনের পোশাকে অন্যকে শোভিত করতে উন্মুখ ছিলেন তিনি। সেই চিন্তা থেকে তিনি চট্টগ্রাম থেকে আসার পরে আড়ংয়ে গিয়ে ডিজাইনার মাহিন খানের সৃষ্টিশীল ডিজাইন পর্যবেক্ষণ করেন। সেখান থেকেই ডিজাইনার হওয়ার অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ পেয়েছিলেন। বেশ কয়েকজনের পরামর্শে রুনি ১৯৮২ সাল থেকে ডিজাইন করে আসছেন, তবে ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি স্বতন্ত্র ডিজাইনার হন।

রুনি ২০০২ সালে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যানহাটন সেন্টার, ঢাকা ক্লাব, কুইন্স প্যালেস, ক্লাব সনম, ফাইফ স্টার ব্যাংকুয়েট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টসহ অন্যান্য স্থানে অবস্থিত বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের সংগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন।

২০০৮ সালে রুনির বুটিক শপ ‘রুনি’স ডিজায়ার’ যাত্রা শুরু করে, যেখানে সাউথ এশিয়ান পোশাকের পাশাপাশি তিনি ইসলামিক স্টাইল ড্রেসও ডিজাইন করেন, যেমন-হিজাব। তার লক্ষ্য ছিল, ডিজাইনের পরিবর্তন আনা যাতে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ফ্যাশনের সমন্বয়ে ঘটে।

রুনি অন্যের পোশাক ডিজাইনের অন্ধ অনুকরণ পছন্দ করেন না, তার পোশাক ছিল নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তার ডিজাইনে প্রাধান্য পেত এয়ারব্রাশ, হ্যান্ড পেইন্ট, ব্লক, টাই ডাই, বুটিক ও কারচুপি। তার কাপড়ের বেশির ভাগ উৎপাদন হতো ঢাকায়। একসময় তাঁর পোশাকের চাহিদা নিউইয়র্কের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রসারিত হয় কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ায়।
কিংবদন্তি ডিজাইনার মাহিন খান (মন্ত্র), বিপ্লব সাহা (রং), বিবি রাসেল, শাহরুখ শহীদ এবং ভারতীয় ডিজাইনারদের মধ্যে মনিশ মালহোত্রা,সব্যসাচী মুখার্জি প্রমুখের সাফল্য রুনিকে অনুপ্রাণিত করেছে।

রুনির ডিজাইন করা কাপড়ের ব্যাপক চাহিদার কারণে তিনি এখন কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে রুনি’স ডিজায়ারের শাখা খুলতে চাচ্ছেন। তিনি এখন আরও বেশি ফ্যাশন শোতে অংশ নিতে চাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে অনলাইন স্টোর খোলারও পরিকল্পনা করছেন। কান উৎসবে যোগ দিয়ে তাঁর একটা স্বপ্ন পূরণের কথা বললেন। এ ছাড়া ২০১৭ সালে সফল নারী হিসেবে সম্মাননাও পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0