ঈদে-পার্বণে, বৈশাখে-বসন্তে আমার ঘরটা বেশ ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে। আমার ছেলেমেয়ের মধ্যে নানা চাঞ্চল্য দেখি। নিজেদের নানা ব্যর্থতার সালতামামি করি। ভেবে খুশি হই, শিকড়ের সন্ধান করছে তারা। অনেকটা অন্ধকারে থেকেই একটা সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছে। স্বদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে খুব ভালো করে পরিচয় করাতে পারিনি বলে অনুতাপ বাড়ে। 

লক্ষ করি, প্রতিবছর কোরবানি ঈদ এলেই আমার ছেলে দরজা ভালো করে বন্ধ করে ঘুমায়। মেয়েটা ছবি আঁকে। ঈদের ছবি।

নিউজার্সির যে শহরে থাকি, সেখানে স্বদেশিদের কোনো আনাগোনা নেই। পরিহাসের মতো শোনায়। স্বদেশিদের নিয়ে আমার নিত্যকর্মকাণ্ড। তাদের কাছাকাছি না থাকার মর্মবেদনাটা টের পাই। সন্তানেরা ৫০ মাইল দূরের নিউইয়র্কযাত্রাকে ভিন্ন দেশে যাত্রা মনে করে। কৈশোরে বাবার হাত ধরে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার কথা মনে পড়ে আমার।

এক সুহৃদ একবার একটা আইপি বক্স দিয়ে বলেছিলেন, এটা বাসায় লাগিয়ে দেবেন। বাচ্চারা বাংলা টিভি দেখতে পারবে। সন্তানদের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি শিখতে কাজে লাগবে। প্রথম দিনই তারা দেখে আমার দুই বন্ধু টিভিতে টক শো করছেন। এ নিয়ে চরম উত্তেজনা। ‘বকবকানি টিভি’ উল্লেখ করে বক্সটি তখনই বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাব এল। আমার ভোট ছাড়াই সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়িত হয়ে যেতেও দেখলাম।

মেয়েকে একদম শিশু অবস্থায় আমাদের ভাষা আর সংস্কৃতি তালিম দেওয়ার স্বেচ্ছা দায়িত্ব নিলেন আমার মা। তিন–চার বছর বয়সের নাতনিকে নিয়ে দাদি বসেন। আগে শুনতাম মায়ের উচ্চকণ্ঠ।

যোগ হলো দুজনের নানা কথাবার্তা। দাদি বলেন এক কথা, নাতনি বলে চার কথা। দাদি শেখানোর চেষ্টা করেন ‘স্বরে অ’। নাতনি বলে, এ আবার স্বরে হবে কেন? দাদি তাঁর স্বামীকে চিঠি লেখার গল্প করেন। নাতনি বলে, তোমরা কি এতই গরিব ছিলে যে একটা কম্পিউটার ছিল না, ই-মেইলও করতে জানতে না?

নয় সন্তানকে বাল্যশিক্ষা দেওয়া আমার মা স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিলেন। অবশ্য শারীরিক কারণকে উল্লেখ করলেন ইস্তফার নোটিশে। এর মধ্যে আমার শাশুড়ি এলেন দেশ থেকে। আমি খুবই আনন্দিত। সবাইকে ঘোষণা দিলাম, স্কুলশিক্ষিকা নানি আসছেন। এবারে ছেলেমেয়ের বাংলা শেখাটা হবে। ধর্মকর্ম শিখতে পারবে। আমার সব অনুতাপ দিনের অবসান হবে।

আমার মা বললেন, হুম্!

কেন মা?

যারা মাস্টারি করেছে সারা জীবন, তাদের মাথায় আর কিছু আছে নাকি! সব অন্যদের দিয়ে দিয়েছে!

রেগে গেলে বাবাকে নিয়ে মা এমন কথা প্রায়ই বলতেন। আমার স্ত্রী সামনে বসা। তাঁর সামনে এমন কঠিন কথা আমি বুদ্ধি দিয়ে সামাল দিই। শিক্ষকেরা যে সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষ, তা নিয়ে কথা বলে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি।

নানি আসার পরই আমার মেয়ে জানতে চায়, কোন সাবজেক্টে তিনি পড়াতেন। বেশ অহংকারের সঙ্গে নাতনিকে জানালেন, তিনি স্কুলে সারা জীবন ইংরেজি পড়িয়ে এসেছেন। আমার মেয়ে আমাকে জানাল, ইংরেজির শিক্ষক তাঁকে কেমন করে বাংলা আর ধর্ম শেখাবে?

আমি বিপদ টের পেতে শুরু করলাম। এর মধ্যে আমার সম্পাদক মতিউর রহমান শিশুদের জন্য বাংলা শেখার কিছু বই পাঠালেন। গণসাক্ষরতা নিয়ে আজীবন কাজ করেছেন আমার কাজিন আ ন স হাবীবুর রহমান। তিনিও কিছু শিশুশিক্ষার বই পাঠালেন।

বলা হলো সামারে স্কুল ছুটি। এ সময়টাতে অবশ্যই লাঞ্চের পর দুই ঘণ্টা করে বাংলা পড়তে হবে। শুরু হলো বেশ ঘটা করে। নানি বসেন নাতি-নাতনিকে নিয়ে, আর দাদি পাশে বসেন পানের বাটা নিয়ে।

এক সপ্তাহের মধ্যেই দেখলাম স্কুলের বড় শিক্ষার্থী উধাও। জিজ্ঞেস করলাম, প্রমিত কোথায়?

মা বললেন, সে পোকেমন নিয়ে খেলছে। সামারের দুপুরে প্রমিতকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। আর যাবেইবা কেন?

—যাবে না কেন মানে?

—ধর্মশিক্ষার জন্য পাঠানো যে লোক হুজুরের সামনে থেকে নিয়মিত পালাত, তার ছেলে দাদি–নানির কাছে পড়তে বসে থাকবে, এমন সুখকর ভাবনা তোমার মাথায় এল কেমনে?

মহাবিপদ টের পাই। আমার মা রেখেঢেকে কিচ্ছু বলতে পরেন না। একদম শাশুড়ির সামনে সব বলতে শুরু করেছেন! কোন সন্তান তাঁকে সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে, এ নিয়ে কথা শুরু হয়ে যাচ্ছে দেখে আমি চেহারায় বেশ কঠিন ভাব নিয়ে আসি।

অন্যজনের প্রোগ্রেস জানতে চাই।

আমার শাশুড়ি জানালেন, খুবই উৎসাহজনক। বাংলা অক্ষর অনেকগুলোই শিখে ফেলেছে আমার মেয়ে। অ লেখতে গিয়ে চাঁদের ছবি এঁকে ফেলেছে। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে আইসক্রিম ট্রাক খুঁজতে গেলাম।

পরদিন আমার ছুটি। বাংলা স্কুল বসেছে বাইরের কক্ষে। আমার মা গেছেন তাঁর কোনো এক আহ্লাদী মেয়ের বাসায়। হঠাৎ শুনি, আমার শাশুড়ি দোয়া ইউনুস সজোরে পড়ছেন। আমি বলি, এখনই আরবি শিক্ষার দরকার নেই আম্মা, আগে বাংলাটা শিখিয়ে দেন! দোয়াদরুদ পরে শেখাবেন।

আমার শাশুড়ি জানালেন, তিনি আর নাতনিকে পড়াতে পারবেন না। বললেন, যেন দোয়া করি, যে ইমান নিয়ে আমেরিকায় এসেছেন, সেই ইমান নিয়ে ফিরে যেতে পারেন!

—কী হয়েছে, আম্মা!

কিছুই বলছেন না। শরীর কাঁপছে। আর জোরে জোরে দোয়া ইউনুস পড়ছেন।

মেয়েই জানাল, তাঁর নানি কিছুই জানেন না।

—কী জানেন না?

মেয়ের বিবরণ থেকে জানলাম, তখন টিভিতে ‘এলেন ডিজেনারেস’ (Ellen DeGeneres) শো চলছিল। জনপ্রিয় এ টিভি তারকা যে সমকামী, এ কথা নানিকে বোঝাতে চেষ্টা করছে নাতনি। নানি প্রথমে কিছু বুঝতে না পেরে কিছু উৎসাহ দেখিয়েছেন। নাতনি বিস্তারিত বোঝানো শুরু করলে নানি ইমান রক্ষার দোয়াদরুদ শুরু করেন। আমাকে জানিয়ে দিলেন, তিনি আর এ স্কুল চালাতে পারবেন না। ইমান রক্ষা করার কাজে তাঁর মনোযোগ দিতে হবে। এদের সঙ্গে কথা বললে তাঁর ইমানে দুর্বলতা চলে আসবে!

এর মধ্যে কোরবানি ঈদ চলে এল। কোরবানি শব্দটা বারবার উচ্চারিত হতে থাকে পারিবারিক আলাপে। আমার মা জানালেন, বয়স হয়েছে। যেকোনো সময় মারা যাবেন। দেশে কোরবানি দেওয়া হচ্ছে, হোক। আমেরিকায় গরু জবাই করে কোরবানি দিতে হবে। নাতি-নাতনিকে দেখাতে হবে, পশু জবাই করে আমরা কেমন ত্যাগ করি।

আমি ইতিউতি করতে থাকলেই তো আর কিছু হবে না। ঘরে আওয়াজ ওঠে, ধর্মকর্মের কোনো ব্যাপার আসলে এমন করা একদম খারাপ কাজ। এ কথা উচ্চারিত হতে থাকল বিরামহীন ঘণ্টাধ্বনির মতো।

শেষ পর্যন্ত ভাইবোনদের খবর দেওয়া হলো। সবাই মিলে নিউজার্সির এক খামারে গিয়ে বিরাট গরু জবাই করা হলো। মেয়েকে সঙ্গে নেওয়া গেল না। আমার ছেলে, ভাইবোনদের ছেলেদের নিয়ে আমরা গেলাম কোরবানি করতে। গরু জবাই দেখিয়ে সরা দিন পার করে বিকেলে আমরা ফিরলাম। মা–সহ ভাইবোনরা সবাই মিলে বাড়ির পেছনের ডেকে কসাইখানা বসালেন।

প্রমিতকে কাঁদতে দেখে মা জানতে চাইলেন, কাঁদছ কেন, দাদু?

ছেলে জানাল, জবাই আর রক্ত দেখে সে খুব ভয় পেয়েছে। সে আর কোনো দিন গরুর মাংস খেতে পারবে না।

—এমন জবাই কেন করা হয়, দাদু? এটা নিষ্ঠুরতা। এটা ভয়ংকর। এত রক্ত! বলেই ছেলেটা কাঁদতে শুরু করল।

মা জানালেন, এটা খুবই পুণ্যের কাজ। ভয়ের কোনো কারণ নেই।

আমি বললাম, কোরবানির বিষয়টি কীভাবে এসেছে, সেটা বললে সে বুঝবে মনে হয়। একটু বুঝিয়ে বলো তোমার নাতিকে।

এ কথা বলে আমি কলিজা ভুনা কতক্ষণে হবে জানতে চেয়ে একটা আওয়াজ দিলাম আর ঘণ্টাধ্বনির অপেক্ষা করতে থাকলাম!

আমার মা তাঁর নাতিকে বুঝিয়ে বললেন, আমাদের প্রফেট ইব্রাহিম (আ.) স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাঁর একমাত্র পুত্রকে কোরবানি দিতে চেয়েছিলেন। জবাই করার সময় আল্লাহর নির্দেশ আসে। শেষ পর্যন্ত পুত্রকে জবাই করতে হয়নি। পুত্রের পরিবর্তে আল্লাহপাকের ইচ্ছায় একটি পশু কোরবানি হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে সবচেয়ে প্রিয় পশুটি জবাই করে কোরবানি দেওয়া হয়!

আমার বোকা ছেলে তার প্রশ্নের জবাব কতটা পেল কে জানে! এরপর থেকে দেখি কোরবানির ঈদ এলেই ছেলেটি নিজের রুমের দরজা ভালো করে বন্ধ করে ঘুমায়। আমার দিকে আড়চোখে তাকায়। সম্ভবত বুঝতে চায়, আমার কাছে নির্দেশনাটি পৌঁছেছে কি না!

কিছুদিন পর মা মারা গেলেন।

আমরা যতটা শূন্য হলাম, তার চেয়ে বেশি শূন্যতা আর হাহাকার আমাদের সন্তানদের। দাদু–নানুকে নিয়েই তাদের সব পারিবারিক গল্প। আমরা শুনে যাই। শুনে কষ্ট পাই। ঈদ-পার্বণে এ আলাপ বেশি হয়। আমাদের হাহাকার বাড়ে।

কোরবানির ঈদ এলেই আমার ছেলে জিজ্ঞাসা করে, এবারে কোরবানি দেবে না? এ কথা বলে আমার ছেলে দাদুকে স্মরণ করে। এখন নিজে চাকরি করছে। কত বেতন পায়, তা জানায় না। এসব নাকি কাউকে জানানোর নিয়ম নেই!

কোরবানি ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকে দেখি নিজের রুমের দরজা টাইট দিয়ে ঘুমায়। ভিতু চেহারায় জানায়, সে নিজেই কোরবানি দেবে এবারে। বলেই নিজের কক্ষের দরজা আবার টাইট করে বন্ধ করে দেয়! দাদুর কাছে শোনা কোরবানির গল্পটি মনে হয় তাকে তাড়া করে। কোরবানি হয়ে যাওয়ার পর কক্ষটির দরজা খোলাই থাকে রাতবিরাতে।

আমার মেয়ে ‘স্বরে অ’ লেখা শিখতে গিয়ে চাঁদ আঁকিয়ে হয়েছিল। এখন অন্য ছবিও আঁকে।

ফুল, নদী, প্রজাপতি, মিকি মাউস—সব। আমি বলি, ‘আঁকো মা, স্বদেশের মুখ, তোবড়ানো গাল, ভেঙে যাওয়া বুক।’

ইব্রাহীম চৌধুরী, আবাসিক সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সংস্করণ।
ibrahim.chowdhury@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0