‘আমি প্রজন্ম সমতা: নারীর অধিকার’—এই স্লোগান নিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। দেশের বাইরে বাঙালি নারী বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের নারীর লড়াই ভিন্ন হলেও তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। নিউইয়র্কসহ আমেরিকায় বাংলাদেশি নারীদের অনেকেই নিজেদের যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন অনেকের কাছেই। তবে এটিও ঠিক, অভিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ বাংলাদেশি নারীই কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন। উদ্যোগের অভাব, দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা পশ্চিমের এ দেশে বাংলাদেশি নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন নিউইয়র্কের অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নারী। অভিবাসী ভিসায় বা নানাভাবে এ দেশে এসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এসব নারী এর মধ্যেই নিজেদের নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। একটা সময় যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এসে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তাও ছিল অধরা স্বপ্নের মতো। আজ সেই অধরা স্বপ্নের পালকে এগিয়ে যাওয়ার স্লোগানে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মুখ উজ্জ্বল করছেন এসব নারী।
বিশ্বের রাজধানী বলে খ্যাত নিউইয়র্ক নগরে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগে বাংলাদেশি নারীদের বিচরণ চোখে পড়ার মতো। চিকিৎসক, ল

ফার্ম, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগ, আমেরিকার মূলধারার রাজনীতি নির্বাচন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ট্যাক্সিক্যাব চালনা থেকে শুরু প্রত্যেক খাতে কাজ করছেন বাংলাদেশি নারীরা। 

চার দশক আগে নিউইয়র্কে আসা বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি নার্গিস আহমেদ এ নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা জানালেন। বললেন, গত চার দশকে আমেরিকায় বাংলাদেশি নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস অনন্য। পশ্চাৎপদ সমাজ থেকে এসে বাংলাদেশি নারীরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিকই আমেরিকায় মূলধারায় দাপটের সঙ্গে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
নিউইয়র্কের এমন কয়েকজন নারী আছেন, যাদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে প্রবাসী কমিউনিটি। তাদের মধ্যে নিউইয়র্ক কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট ১৪ প্রাইমারি নির্বাচনে লড়ছেন বদরুন খান মিতা, নিউইয়র্ক পুলিশের প্রথম বাংলাদেশি নারী সার্জেন্ট ফজিলাতুননিসা, ল ফার্মে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন নার্গিস চৌধুরী, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া হোসেন, কড়াই কিচেনের গুলশানারা আহমেদ। এঁদের মতো নারীরা প্রবাসে করছেন বাংলাদেশিদের মুখ উজ্জ্বল। রানী কবির বা নার্গিস আহমেদ যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তা এগিয়ে যাচ্ছের অন্য আরও নারীরা। তাঁরা অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছেন প্রবাসে আসা নতুন স্বদেশি নারীদের কাছে।
শুধু নিউইয়র্কে নয়, আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের বিজ্ঞানী নিনা আহমেদ একজন নারীবাদী ও প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি আমেরিকান হিসেবে বেশ পরিচিত মুখ। বর্তমানে রাজ্যের অডিটর জেনারেল পদে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি। এর আগে তিনি এশীয় আমেরিকান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জবাসীর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার উপদেষ্টা কমিশন ও এশিয়ান আমেরিকান বিষয়ক মেয়র নাটারের কমিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাবিলাহ ইসলাম ইউএস কংগ্রেস নির্বাচনে অভিবাসী নারীদের সাফল্যের ধারায় নিজের নাম লেখাতে মাঠে নেমেছেন। আগামী নির্বাচনে জর্জিয়ার ডিস্ট্রিক্ট ৭ থেকে কংগ্রেসে লড়তে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। গল্প এখানেই শেষ নয়, মাহজাবীন হক মা-বাবার সঙ্গে ২০০৯ সালে এ দেশে আসেন। ছোটবেলা থেকেই নাসায় কাজ করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন ঠিকই এবং উজ্জ্বল করেন বাংলাদেশের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি তিনি। 
মরণব্যাধি লুপাসের বিরুদ্ধে লড়ে নতুন করে নিজেকে তৈরি করেন শাহানা হানিফ। ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে কাউন্সিল মেম্বারপ্রার্থীর ঘোষণা দিয়ে কম বয়সে সবাইকে চমকে দেন তিনি। তিন দশক থেকে টানা নির্বাচিত এক শ্বেতাঙ্গ নারীর বিরুদ্ধে রাজ্য অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশি মেরী জোবাইদা। 
সুন্দরী প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশি নারীরা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মৌমিতা খন্দকার সুন্দরী প্রতিযোগিতায়ও স্টেট পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছেন। 
প্রবাসে বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের এমন এগিয়ে যাওয়ার গল্পের উল্টো দিকে আছে ব্যর্থতার চিত্র। অভিবাসী বাংলাদেশি নারীদের ৭০ শতাংশই এখনো কর্মহীন। ২০১৫ সালের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হয়ে আসা নারীদের অনেকেই আমেরিকার কর্মপ্রবাহ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেন। নিজেদের উদ্যোগের অভাব, সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতাকে এর কারণ বলে মনে করেন নিউইয়র্কে বসবাসরত প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান।
নিউজার্সিতে নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন সিলেটের তাহনিনা চৌধুরী। এ প্রতিবেদককে জানালেন, আমেরিকায় নানা ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। নিজেদেরই এ সুযোগের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঘটনায় বাঙালি নারীরা প্রমাণ করেছে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক সচেতনতার। বাংলাদেশে সংগঠিত প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলন, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করেছেন। সেই উদ্দীপ্ত জাগরণে নারীরা প্রবাসেও নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাবে—এমনটা প্রত্যাশা কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন