বাবা আমাদের পেটের নিচে হাত দিয়ে ভাসিয়ে রাখতেন আর আমরা হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটতাম। সেই থেকেই জলে কিংবা স্থলে নির্ভয়ে সাঁতার কেটে চলেছি। হেরে যাইনি। জয়ী হয়েছি বারবার।
কালীগঞ্জ আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর। একমাত্র বাহন ছিল রিকশা। কিন্তু বাবা আমাদের শুক্রবারের হাটে নিয়ে যেতেন পায়ে হেঁটেই। অনেক দূর তাই পায়ে হেঁটে যেতে অনেক কষ্ট লাগত। কিন্তু বাবা বলতেন, ব্যায়াম করবি। দৌড়াবি। শরীর ও মন ঠিক থাকবে। হাট থেকে ফেরার পথে আসতাম রিকশায়। আবার তাও অল্প রাস্তায়। কালীগঞ্জ বাজার টু আড়িখোলা রেলস্টেশন পর্যন্ত। আবার বাকি রাস্তায় পায়ে হেঁটে। দূরত্ব ছয় থেকে সাত কিলোমিটার।
বাবার সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার সেই মুহূর্তে চোখে পড়ত এশিয়ার বৃহত্তম কালীগঞ্জ মসলিন কটনস মিল। মেশিনের শব্দ। বিশাল আকৃতির গেট। নীল জামা পরা কারখানার শ্রমিক। পাশের জমিতে ভেসে আসা কাপড়ের রং। আড়িখোলা স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা লোকাল মেইল। শত বগি নিয়ে ছুটে চলা মালগাড়ি গুনতাম এক এক করে।
স্টেশনের পাশে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ। তুমিলিয়া পাড়া গ্রামের মানুষের ফসলের জমি। ধান খেত, পাট খেত, সবজি খেত। দেখতাম আর বাবার হাত ধরে হেঁটে যেতাম। আজও বাবার শেখানো পথ ধরে হাঁটি। কখনো হোঁচট খেলে দমে যাইনি। হেরে যাইনি অমসৃণ পথে। বাবা শিখিয়েছেন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আজ বৃদ্ধ বাবা আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সফলতা দেখেন। গর্ব করেন। বাবার প্রাপ্তিতে পূর্ণতার হাসি। অল্পতে বাবা তৃপ্ত ও খুশি। বাবা শিখিয়েছেন, অল্পতে সুখী হওয়ার গল্প। বাবার কাছে বর্তমানটা আসল, অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আফসোস করে কী লাভ? আমার এখন যা আছে, তা নিয়ে সুখে আছি কিনা সেটাই বড় কথা। আমি অল্পতে তৃপ্ত ও সুখী। ঠিক বাবার মতো।
আমি এখন বাবা। একমাত্র কন্যা সন্তানের বাবা। আমার মেয়ে স্যান্ড্রা ছোটবেলা থেকেই আমার বাধ্য। খুব শান্ত স্বভাবের। চাহিদার বেশি কিছু চাইবে না। না পেলেও রাগ করবে না। আমিও তার ভেতরের তৃপ্তি দেখেছি।
আমি এখন বাবা ও মা। আমার কন্যার দেখভাল আমাকে একাই সামলাতে হয়। আমেরিকান ভাষায় যাকে বলে সিঙ্গেল ফাদার। কিন্তু আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নই। আমি একা কেন হব। আমার রয়েছে ভাই-বৌদি, ভাতিজি ও অনেক আত্মীয়স্বজন। আছে বন্ধু-বন্ধন। সবাই আমার কন্যার খোঁজ নেয় সব সময়। অনেকে আমার কন্যাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। তাহলে আমি কেন সিঙ্গেল ফাদার হব?
ওই যে শুরুতে বলেছিলাম। কঠিন বাস্তবতা শিখেছি বাবার কাছ থেকে। এখন তা প্র্যাকটিস করছি। বাবার শেখানো সেই বাস্তবতা আমাকে অনেকে সাহায্য করছে। আমি ভোরে উঠে কাজে চলে যাই। আগের দিন মেয়ের খাবার ঠিক করে রাখি। কখনো রাতে কাজ করি। কখনো বিকেলে। মেয়ে অপেক্ষায় থাকে কখন আমি ঘরে ফিরব, কখন এক সঙ্গে খাব। দুপুরের খাবার কখনো বিকেলে এসে প্রস্তুত করে মেয়েকে নিয়ে খাই। আবার বিকেলে কাজ হলে ঘরে ফিরি মধ্য রাতে। মেয়ে অপেক্ষায় থাকে। আমাকে দেখেই সে কী খুশির হাসি, তা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। আমার স্থলে কেউ না দাঁড়ালে অনুভব করা অসম্ভব। মেয়ের স্কুল থেকে প্রতিনিয়ত টেক্সট ও ইমেইল পাই। প্রতিদিন দেখতে হয়। আপডেট করতে হয়। অনেক সময় একা কুলিয়ে উঠতে কষ্ট হয়। কিন্তু বাবার শেখানো দমে যাওয়ার পাত্র তো আমি নই!
একজন মা মেয়ের জন্য যা করতে পারে তা হয়তো বাবা হিসেবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যা কেবল মেয়েরা মায়ের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করতে পারে। কিন্তু বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে লজ্জাবোধ করে। আমার মেয়ে এখন ষোলো ছুঁই ছুঁই। সে এখন নিজেকে আলাদা ভাবতে শিখেছে। সে এখন বুঝতে শিখেছে সে একজন নারী। বিষয়টি আমাকে ভাবায়। বিশ্ব বাবা দিবসে আমি বাবার কাঠগড়ায়। আমি পৃথিবীর সব কন্যা সন্তানদের প্রতিচ্ছবি আমার কন্যার মুখে দেখি। যারা পিতৃহীন-মাতৃহীন তাদের করুণ মুখগুলো আমার সামনে ভেসে ওঠে। যারা জন্ম থেকে বাবা হারিয়েছে তারা পৃথিবীর অর্ধেক সুখ থেকে বঞ্চিত। কিংবা যারা শিশুকালে মা হারিয়েছে আবার মা যখন বন্ধু তখন মা হারিয়েছে, তাদের কষ্টের ওজন পরিমাপ করার যন্ত্র আমি বক্ষে আগলে রেখেছি।
সন্তানের চাপা কষ্টের আয়তন কত হতে পারে আমি তা মর্মে মর্মে অনুভব করি। সন্তান বাবাকে বুঝতে দেয় না ভেতরের শূন্যতা। পৃথিবীর সব বাবা মেয়েদের সম্পর্কটা বুঝি এই রকম।
আমি একজন গর্বিত বাবা এই কারণে, আমার মেয়ে বাংলা পড়তে না জানলেও আমার লাইব্রেরির তাকে রাখা আমার বইটা অন্য সব বই থেকে আলাদা করে বুকে আগলে রাখতে শিখেছে। আজকে বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবাহীন সন্তানদের জন্য রইল বাবা দিবসের ভালোবাসা, আদর ও আশীর্বাদ।