অতটুকু চায়নি বালিকা

বিজ্ঞাপন

মফস্বল শহরের ছাদ থেকে গ্রীষ্মের আকাশ দেখছিল মৌমিতা। মেঘ, বৃষ্টি আর জোনাকির এক অপূর্ব খেলা। আকাশের একদিকে মেঘের দ্রুত ভেসে যাওয়া। কখনো প্রায় পূর্ণ চাঁদের আলো। আচমকা বিদ্যুৎহীন রাত। ছাদ থেকে এ শহরটাকে ভিন্ন লাগে। শহরটা এরই মধ্যে নগর হয়ে উঠেছে। আগে এ শহরে গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখত। এখন চাঁদ দেখে আকাশ ছোঁয়া দালান কোঠার ফাঁক দিয়ে। বাড়ির সামনের শিরীষ গাছটা এখন আর ছায়া দেয় না। গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষ ছায়া খোঁজে কংক্রিটের আড়ালে।
মৌমিতার বুকে কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর আর্তনাদ ওঠে—‘আমি একা, এই ব্রহ্মাণ্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা।’ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে আকাশে একটা বিমান উড়ে যায়। গর্জনটা নিজের বুকে টের পায় সে। কোথায় যায় উড়োজাহাজটি? একই আকাশের নিচে থাকা মানুষগুলো প্রকৃতির একই বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সন্তানদের হাসি-কান্নার কথাও প্রকৃতি ধারণ করে। বসন্তের অবগাহন আসে। আসে বৈশাখের গর্জন, বৃষ্টির কান্না, কখনো আকাশ ঢেকে যায় গুমোট কালো মেঘে। যুবরাজের জন্য মন খারাপ হয় তার।
কী করছে এখন ছেলেটা? দূর দেশে যাওয়া ছেলেটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। নিজের জীবনে প্রথম কোনো কান্নার আওয়াজ মৌমিতাকে সুখ দিয়েছিল। মা হওয়ার দিনটার কথা মনে পড়ে তার। কপালে বিপ্লবের চেনা হাতের ছোঁয়ার মধ্যেই জ্ঞান ফিরছে। চোখ মেলে দেখছে মিটমিট করে চেয়ে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শিশুটি। ‘কেমন আছিস বাপ?’ বুকের মধ্যে অজানা গর্জন ওঠে!
মৌমিতা আর বিপ্লবের ছেলেটি এখন কানাডায়। একুশ বছর বাবাকে দেখেনি। বাবাকে সামনাসামনি দেখার স্মৃতিও তার মনে নেই। টেলিফোনে কথা হয়। ভিডিও কলে বাবার ছবি দেখে। এ গ্রীষ্মের ছুটিতে যুবরাজের বাবাকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। এপ্রিলে কানাডা থেকে লন্ডনের ফ্লাইট। মার্চেই করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে সব ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়।
একদিন একদিন করেই ছেলেটি বড় হলো। শিশু থেকে কৈশোর পেরোনো যুবরাজের প্রতি মুহূর্ত উপভোগ করেছে মৌমিতা। মাতৃত্বের ভালোবাসা নিয়ে করেছে। বাবার দায় পূরণ করতে চেয়েছে। যুবরাজের প্রতি মা ও বাবার যৌথ দায়িত্বটাই পালন করেছে সে।
বাবা প্রবাসী । বিপ্লব নিয়ম করে পরিবারকে টাকা পাঠায়। মৌমিতা শক্ত হাতে ছেলে সামলায়। ছেলে ভালো ফলাফল নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে। রাজধানীতে নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মৌমিতার নতুন যাত্রা শুরু হয়। মফস্বল শহর থেকে রাজধানীর বড় পরিসরে। যুবরাজ বড় হয়ে ওঠে। মেধাবী ছেলেটি সহজেই বিদেশে স্কলারশিপ পেয়ে পড়ার সুযোগ পায়। সে ঢাকা বিমানবন্দরে যুবরাজকে বিদায় জানিয়েছিল।
ছেলে উচ্চশিক্ষার্থে কানাডা যাচ্ছে। মৌমিতা বুকে পাথর বেঁধে উড়োজাহাজটির উড্ডয়ন দেখে। নীলিমায় হারিয়ে যাওয়ার আগে উড়োজাহাজটি একটি গর্জন রেখে যায়। এ গর্জন বুকে নিয়ে সে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। বড্ড একা হয়ে গিয়েছিল সে।
কলেজে পড়ার সময় স্বপ্ন ছিল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নারী জন্মের সাফল্য দেখাবে। তা আর হয়ে ওঠেনি। ব্যক্তিগত স্বপ্ন মাড়িয়ে আর দু-দশটা স্বপ্নের সংসারের মতো এ সংসারও শুরু হয়। যৌথ পরিবারে সবার ভালোবাসার মধ্যেই মৌমিতা-বিপ্লব দম্পতির কোলে আসে ছেলে সন্তান। আদর করে নাম দেওয়া হয় ‘যুবরাজ’।
বিয়ের পর সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে কোনো অসুবিধা হয়নি মৌমিতার। একান্নবর্তী পরিবার। সারাক্ষণ মনে হতো বাড়িতে একটা উৎসব লেগে আছে। শ্বশুরবাড়ি ও শাশুড়ি সম্পর্কে যে ধারণা আমাদের সমাজে দেখা যায়, এখানে তার উল্টোটাও দেখেছিল। তার সংসারে সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক খুবই মধুর। একে অন্যের প্রতি খুবই সংবেদনশীল।
চা বাগানের বাংলোর মতো বাড়ি। বিপ্লবের পরিবারের গাড়ির ব্যবসা। সম্পন্ন পরিবার। মৌমিতা আর বিপ্লবের সংসার চলছিল আনন্দ আর স্বপ্নের যুগলবন্দীতে। দাম্পত্যের ঘোরে তার মনে হতো, পৃথিবীর সব সুখ, সব সৌন্দর্য দেখা যায় না। সে কেবল অনুভবের। সে একান্ত অবগাহনের। ভালোবাসা যখন নির্ঘুম করে দেয়, তখন তা নিছক দাম্পত্যের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে।
কোলে ফুটফুটে বাচ্চা নিয়ে মৌমিতা সংসার সামাল দেয়। নিজের লেখাপড়াও চালিয়ে যায়। শহরের সরকারি কলেজ থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে ডিগ্রি পাস করে । জীবনের সৌন্দর্য অবগাহনের তীব্রতায় বিহ্বল তখন সে। উড়ন্ত মৌমাছি, শিশুদের কলকাকলি, বৃষ্টির শব্দ আর রোদের ঝিলিক তাঁকে তাড়িত করে। দৃষ্ট আর অদৃষ্টের হাতছানিতে জীবন ভাসিয়েছে। কোনো কোনো মানুষ স্বপ্ন দেখে বাস্তব মোকাবিলা করে। কোনো কোনো মানুষ বাস্তব মোকাবিলা করেই নিজের জীবনকে স্বপ্নের জীবনে রূপান্তর করে।
মৌমিতার স্বামী বিপ্লব। স্মার্ট সুদর্শন শিক্ষিত চটপটে ছেলে। পারিবারিক ব্যবসার বাইরে গিয়ে দ্রুত সাফল্য চায়। সাফল্যকে নিছক দুর্ঘটনা মনে করেনি বিপ্লব। লেগে থাকা আর পরিশ্রমের পথ বেয়েই সে সাফল্য আসে, এ কথাটি তার অজানা, তা বলা যাবে না। জীবনের মহাসড়কে অনেক ফাঁদ, এ কথাটি জানতে অবশ্য বিপ্লবের বেশি সময় লাগে না। দেশজুড়ে তখন শেয়ার ব্যবসার রমরমা। বাজার অর্থনীতির ফাঁদটা বিপ্লবের কেন, অনেকেরই জানার কথা নয়। সে দ্রুতই বিনিয়োগের অর্থ জ্যামিতিক হারে বাড়াতে থাকে। তাকে নেশায় পেয়ে বসে। একদিন ধস নামে শেয়ারবাজারে। বাজারের বজ্রপাত থামানোর অদৃশ্য হাত চেনা নেই সাধারণের। পুঁজিবাজারের খেলোয়াড়েরা সব হাতিয়ে নেয়। দেশের শেয়ারবাজারের নিঃস্ব বিনিয়োগকারীর তালিকায় নাম যুক্ত হয় বিপ্লবের।
সাফল্য দ্রুত থমকে দাঁড়ায়। এমন অবস্থায় মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোঁজে। বিপ্লব তখন মরিয়া হয়ে ওঠে পশ্চিমের দেশে পাড়ি দেবে বলে! অবৈধ পথেই জীবনের বাজি রাখে সে। দ্রুতই তার ঠিকানা হয়ে ওঠে টেমস নদীর পারে। অবৈধ অভিবাসী হয়ে পশ্চিমের দেশে তার জীবনসংগ্রাম শুরু হয়।
নতুন এ সংগ্রামে মৌমিতা আর বিপ্লবের জীবন কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেকটা অজান্তেই লড়াইয়ের মাঠ বদলে যায়। বিপ্লবও জীবনকে ভাসিয়ে দেয় অন্য স্রোতে। অর্থ আর বিত্তের সাফল্য দেখতে চায়। মৌমিতার লড়াইও ভিন্ন মাত্রা পায়।
বিপ্লবের অনুপস্থিতিতে মৌমিতার লড়াই একার লড়াই হয়ে ওঠে। ছেলে বড় হচ্ছে। স্বামী প্রবাসী। স্বামী ছাড়া সংসার দ্রুত বদলে যেতে থাকল। এ বদলে যাওয়া কখনো স্বার্থের, কখনো সময়ের অপরিহার্যতার। বিপ্লবদের যৌথ পরিবার ভেঙে পড়ে। স্থাবর সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায়। বিপ্লবের অনুপস্থিতিতে সম্পত্তি বেহাত হয়। যৌথ পরিবারের মানুষগুলো যে যার মতো করে বদলে যায়। মানুষ বদলে যাওয়ার সূত্রগুলো সে আবিষ্কার করতে থাকে। কখনো ভাবেনি, এ মানুষগুলো ছাড়া জীবন কেমন হতে পারে?
ফেসবুকে নিজের টাইমলাইন আর অন্যজনের টাইমলাইন যে সমান নয়, তা এবার টের পায় এখন। জীবনের নানা সময়ে মানুষ আসবে, আবার চলে যাবে—এমন প্রস্তুতি কারও থাকে না। মৌমিতারও ছিল না। চারপাশের মানুষ যে বদলে গেল তাই নয়, নিজের বদলে যাওয়াটাও টের পায় এবার। প্রবাসী স্বামীর জন্য বুক হাহাকার করে। তার জীবনের নৌকা ভাসতে থাকে ভাসান পানিতে। এই তীব্র হাহাকারের মধ্যেই জীবন বদলাতে থাকে।
আমেরিকার এক সেনাসদস্যের একাকিত্বের যন্ত্রণা মৌমিতা পড়ছিল অনলাইনে। আফগানিস্তান থেকে ইরাক হয়ে সিরিয়ার রণাঙ্গনে ১৫ বছর কাটাচ্ছে এক মার্কিন সেনা। বিয়ে করার পরই সেনা সদস্যটি যুদ্ধে গিয়েছিল। চিঠিপত্র পায়, ফোনে কথা হয়। দীর্ঘ সময়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা হয় না এ সৈনিকের স্ত্রীর। কেলি নামের এ মার্কিন নারী লিখেছে, ‘একাকিত্ব আমার আমিত্বকে যেন ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রথম দিকে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়তাম। নিজেকে ভালোবাসাহীন মানুষ, সবার ভুলে যাওয়া মানুষ হিসেবে মনে করতাম। আমি মুটিয়ে যেতে থাকলাম। নিজের বুদ্ধিও যেন লোপ পেতে লাগল। নেতিবাচক চিন্তার ভারে নিজেই ধ্বংস হচ্ছি, টের পাই। নিঃসঙ্গতা আমাকে প্রতিবন্ধী করে তুলেছে।’ কেলির লেখায় উঠে এসেছে একাকিত্বের কারণে তার আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাওয়ার কথা। নিম্ন আত্মমর্যাদার কারণে সে একাকিত্বের চক্র ভেঙে বের হয়ে আসতে পারছে না। নিজের সামাজিক দক্ষতাগুলোর ঘাটতি লক্ষণীয় হয়ে উঠছে। সামাজিকতাকে ভয় পাওয়া শুরু হয়েছে। নিজের মধ্যে অকারণ লজ্জাবোধের জন্ম নিয়েছে। সমাজ এবং আশপাশের অন্য মানুষের প্রতিও নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠছে।
মৌমিতা ভেবেছে মার্কিন নারী কেলিকে আমাদের কবি মহাদেব সাহার কবিতাটি যদি পাঠিয়ে দেওয়া যেত। নিজের মনেই উচ্চারণ করতে থাকে কবিতাটির কয়েকটি লাইন—
‘তোমার আসার কথা ছিল, তোমার যাওয়ার
কথা ছিল-
আসা-যাওয়ার পথের ধারে
ফুল ফোটানো কথা ছিল
সেসব কিছুই হলো না, কিছুই হলো না;
আমার ভেতরে শুধু এক কোটি বছর ধরে অশ্রুপাত
শুধু হাহাকার
শুধু শূন্যতা, শূন্যতা।’
প্রবাসী স্বামীর সুন্দরী স্ত্রী মৌমিতা। বছরের পর বছর একাকী আছে। সমাজ, স্বজনের কেউ বসে নেই। এর ওর নানা ইঙ্গিত, প্রেম প্রস্তাব—এসব স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সমাজের আরেক কদর্য রূপ দেখতে হয় তাকে। মনটা স্বাভাবিক রাখাই কঠিন হয়ে ওঠে। সময় দ্রুত গড়ায়। গল্প উপন্যাসের পাঠ পরিবর্তনের চেয়েও এ দ্রুততা যেন বেশি। সে জানতেও পারে না সমাজ, দেশ শুধু এক বিপ্লবকেই ফাঁদে ফেলেনি।
মৌমিতাকেও ফাঁদে ফেলার নানা আয়োজন, নানা প্রলোভন চলছে! এসব এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া এক নারীর কষ্টের কথা ভুক্তভোগীরাই শুধু বলতে পারবে। নিজেকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। সে ভাবে, মানুষের কাছে নিজের জীবনটাই তো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে নিজের ভালোবাসার দাবিটাই কখনো কখনো মুখ্য হয়ে ওঠে।
মৌমিতা ভাবে , জীবনটা প্রথমত আমার। এ জীবন অন্যেরও। কিন্তু আমার জীবনের চাহিদা আমার কাছেই বেশি। সে কি নিজের চাওয়ার ডাকে সাড়া দেবে, না নিজেকে বিলিয়ে দেবে?
বিপ্লবও কী তাই ভাবছে? মৌমিতা তার জীবনকে বিপ্লব ও যুবরাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এভাবেই মানুষের একক জীবন যৌথ জীবন হয়ে যায়? একজনের কর্মে আরেকজন কষ্ট পায়? তার কাছে অলীক সব হাতছানি আসে। প্রলুব্ধ হয়নি বা না হওয়ার কঠিন সংগ্রাম করে গেছে সে। সময়ের কাছে সমর্পিত হয়নি। সময়কে জয় করার লড়াই করেছে বুকে পাথর বেঁধে। কেউ একজন হাত বাড়িয়ে দুদণ্ড শান্তি দেওয়ার কথাও বলেছে। মুখোমুখি বসতে গিয়ে পাশাপাশি বসার কথাও বলেছে।
একসময় জীবন হারিয়ে যায় দৈনন্দিনতায়। বুকে জমানো পাথর। বিপ্লবের সঙ্গেও আজকাল আর তেমন কথা হয় না। দাম্পত্যের পাঁচ বছরের মধ্যে লোকটা পরিবার ফেলে প্রতিষ্ঠার পেছনে ফেরারি হয়েছিল। মৌমিতা জানতে চায় , ‘কবে আসবে বিপ্লব?’
-আর কিছুদিন।
দুই শব্দের এ উত্তরে বুকে ঝলক ওঠে। আবার বিপ্লব আসবে। ক্লান্ত বিকেলে বলবে, ‘আমাকে একটু চা বানিয়ে দেবে?’ অথবা বলবে, ‘আজ তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে।’ বেলা অবেলায় বলবে, ‘লজ্জা পাচ্ছ কেন?’
একুশ বছরের প্রতি দিন রাত হয়েছে এমনি করে। মৌমিতা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজেকে দেখে। জীবন কী শেষ হয়ে যাচ্ছে? জীবন তো একটাই! এ জীবন কী সব সময় একার? দুঃখগুলোও কী সবার একান্ত? ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটাও তো যার যার!
মানুষের অনেক গল্প অকথিত থেকে যায়। গল্প উপন্যাসেও জীবনের গল্প কতটাই বা আসে? সাহিত্যের গভীর পাঠে জীবনের খণ্ডচিত্রই আসে। জীবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া অনুভূতিটা যার যার। এখানে কেউ কারও নয়। আমরা কেবল একটা যোগসূত্র সৃষ্টি করতে পারি। ভাবনার ডানা মেলে দিতে পারি। বুক বিদীর্ণ করা অনুভূতি নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারি। মেকি উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হতে পারি। আসলে আমরা কেউ কাউকে জানি না। জানার ভানটাই করি। নিজেকেও জানতে পারি কি ঠিকমতো? নিজেকে জানতে ও জানাতেই এক জীবন বেশ দ্রুত চলে যায়। মানুষ ফিরে দেখে , অন্যকে জানবে কী, নিজেকেই তার জানা হয়ে ওঠে না। এমন ভাবনার অতলান্তের মধ্যেই বৃষ্টি নামে।
দূরের আকাশে উড়োজাহাজটি সেই কবে হারিয়ে গেছে মেঘের আড়ালে। বৃষ্টিতে ধরণি শীতল হবে। পথিকের পা মাড়ানো ঘাস সতেজ হওয়ার চেষ্টা করবে। মৌমিতার বুকে বিদীর্ণ হাহাকার। দেশান্তরে থাকা বিপ্লব। দূর দেশে আটকে পড়া ছেলে যুবরাজ। একুশটি বসন্ত এমনি চলে গেছে। সবার বুকেই হাহাকার। ভিন্ন ভিন্ন এ হাহাকার।
আবুল হাসানের ‘নিঃসঙ্গতা’ কবিতাটি শুনে শুনে মৌমিতা অন্ধকার সিঁড়িতে পা রাখে—
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরও কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরও কিছু কম!
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনই, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন